শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথার্থ: প্রথম অধ্যায় (অর্জুন-বিষাদ যোগ) সম্পূর্ণ পাঠ
৪৭টি শ্লোক, মূল সংস্কৃত এবং বিস্তারিত বাংলা অনুবাদসহ একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হলো মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ দর্শন। এর প্রথম অধ্যায় অর্থাৎ ‘অর্জুন-বিষাদ যোগ’-এ কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে যুদ্ধের সূচনা এবং অর্জুনের মনের অস্থিরতা বর্ণিত হয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা প্রথম অধ্যায়ের প্রতিটি শ্লোক এবং তার নিগূঢ় অর্থ নিয়ে আলোচনা করব।
১. যুদ্ধের সূচনা ও ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্ন
শ্লোক ১:
ধৃতরাষ্ট্র উবাচ— ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসবঃ। মামকাঃ পাণ্ডবাশ্চৈব কিমকুর্বত সঞ্জয়।।
অনুবাদ: ধৃতরাষ্ট্র বললেন— হে সঞ্জয়! ধর্মভূমি কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের মানসে সমবেত হয়ে আমার পুত্রগণ এবং পাণ্ডুপুত্রগণ কী করল?
শ্লোক ২:
সঞ্জয় উবাচ— দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢং দুর্যোধনস্তদা। আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।।
অনুবাদ: সঞ্জয় বললেন— তখন রাজা দুর্যোধন পাণ্ডবদের ব্যুহবদ্ধ সৈন্যবাহিনী দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে এই কথা বললেন।
শ্লোক ৩:
পশ্যৈতাং পাণ্ডুপুত্রাণামাচার্য মহতীং চমু। ব্যূঢাং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমতা।।
অনুবাদ: হে আচার্য! আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদপুত্র (ধৃষ্টদ্যুম্ন) দ্বারা ব্যুহাকারে সজ্জিত পাণ্ডুপুত্রদের এই বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখুন।
শ্লোক ৪–৬:
অত্র শূরা মহেষ্বাসা ভীমার্জুনসমা যুধি। যযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথঃ।। ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশীরায়শ্চ বীর্যবান। পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ।। যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান। সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।।
অনুবাদ: এখানে ভীম ও অর্জুনের সমান বীর অনেক ধনুর্ধর আছেন— যযুধান, বিরাট, মহারথী দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, বলবান কাশিরাজ, পুরুজিৎ, কুন্তিভোজ এবং শ্রেষ্ঠ নর শৈব্য। এছাড়াও আছেন পরাক্রমশালী যুধামন্যু, বলবান উত্তমৌজা, সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র। তাঁরা সকলেই মহারথী।
২. কৌরব সৈন্য ও শঙ্খধ্বনি
শ্লোক ৭–৯:
(দুর্যোধন সেনানায়কদের নাম উল্লেখ করে বললেন) আপনি স্বয়ং, ভীষ্ম, কর্ণ, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, বিকর্ণ এবং সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবা। এছাড়াও আরও অনেক বীর আছেন যারা আমার জন্য জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
শ্লোক ১০-১১:
আমাদের সৈন্যবাহিনী ভীষ্ম দ্বারা সুরক্ষিত ও অপরিমিত, কিন্তু পাণ্ডবদের বল ভীম দ্বারা রক্ষিত এবং তা সীমিত। তাই আপনারা সকলে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে পিতামহ ভীষ্মকে রক্ষা করুন।
শ্লোক ১২-১৩:
তখন কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম উচ্চৈঃস্বরে শঙ্খ বাজালেন। তারপর শঙ্খ, ভেরি, মৃদঙ্গ ও শিঙা একসাথে বেজে উঠল। সেই শব্দ অত্যন্ত ভয়ানক হয়ে উঠল।
৩. পাণ্ডবদের দিব্য শঙ্খধ্বনি ও রণসজ্জা
শ্লোক ১৪–১৫:
শ্বেত অশ্বযুক্ত বিশাল রথে বসে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন। শ্রীকৃষ্ণ ‘পাঞ্চজন্য’, অর্জুন ‘দেবদত্ত’ এবং ভীম ‘পৌণ্ড্র’ নামক মহাশঙ্খ বাজালেন।
শ্লোক ১৬–১৯:
রাজা যুধিষ্ঠির ‘অনন্তবিজয়’, নকুল ‘সুঘোষ’ এবং সহদেব ‘মণিপুষ্পক’ শঙ্খ বাজালেন। হে রাজন! সেই ভয়ানক শব্দ আকাশ ও পৃথিবী প্রকম্পিত করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় বিদীর্ণ করল।
৪. উভয় পক্ষের মাঝে রথ স্থাপন ও অর্জুনের বিষাদ
শ্লোক ২০–২৩:
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন— হে অচ্যুত! আমার রথটি উভয় সৈন্যদলের মাঝখানে স্থাপন করুন, যাতে আমি যুদ্ধে লড়াই করতে আসা ব্যক্তিদের দেখতে পারি।
শ্লোক ২৪–২৭:
শ্রীকৃষ্ণ রথটি স্থাপন করার পর অর্জুন দেখলেন তাঁর সামনে আত্মীয়-স্বজন, গুরুজন ও বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের দেখে অর্জুন গভীর মোহাচ্ছন্ন ও শোকগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।
শ্লোক ২৮–৩০:
অর্জুন বললেন— হে কৃষ্ণ! এই স্বজনদের দেখে আমার অঙ্গ অবশ হয়ে যাচ্ছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে এবং গাণ্ডীব হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে। আমি অমঙ্গলসূচক লক্ষণ দেখছি।
শ্লোক ৩১–৪৬:
অর্জুন যুক্তি দিতে লাগলেন যে স্বজনদের হত্যা করে কোনো মঙ্গল হতে পারে না। তিনি বললেন, “রাজ্যের লোভে আমরা কুলক্ষয় ও অধর্ম করতে পারি না। কুল নষ্ট হলে কুলধর্ম নষ্ট হয়, নারীরা দূষিত হয় এবং সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ে।” অর্জুন আরও বললেন, “এদের হাতে আমার মৃত্যু হওয়াও ভালো, তবু আমি আত্মীয়দের হত্যা করতে পারব না।”
শ্লোক ৪৭:
সঞ্জয় বললেন— এই কথা বলে গভীর শোকে অর্জুন তাঁর ধনুর্বাণ ত্যাগ করে রথে বসে পড়লেন।
উপসংহার: অর্জুন-বিষাদ যোগের শিক্ষা
গীতার প্রথম অধ্যায়টি আমাদের শেখায় যে জীবনের সংকটে আমরা অনেক সময় মোহ ও বিষাদগ্রস্ত হই। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনের কঠিন মুহূর্তের প্রতিফলন। এই বিষাদ থেকেই শুরু হবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য উপদেশ, যা অর্জুনকে এবং আমাদের সত্যের পথে পরিচালিত করবে।
