হিন্দুর শুধু নেই একতা: অস্তিত্ব রক্ষায় সঙ্ঘশক্তির অপরিহার্যতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় আজ এক ভয়াবহ আপদধর্মকালীন অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সময়ে নিজের জীবন, পরিবার-পরিজন এবং আশপাশের স্বধর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হয়ে উঠেছে সর্বপ্রধান ধর্মীয় কর্তব্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি সংগঠিত, সেই জাতিই টিকে থাকে; আর যে জাতি বিভক্ত, সে জাতি অবশ্যম্ভাবীভাবে বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়।
শাস্ত্রে সঙ্ঘশক্তির প্রয়োজনীয়তা
হিন্দু সমাজের রক্ষার্থে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, এককভাবে সে সমাজ বা জাতিকে রক্ষা করতে পারে না। সঙ্ঘশক্তিই ব্যক্তি ও সমাজকে নিরাপদ রাখে। এই সত্য শুধু ইতিহাসে নয়, আমাদের শাস্ত্রেও সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত। শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
ত্রেতায়া মন্ত্র শক্তিশ্চ জ্ঞান শক্তি কৃতোযুগে।
দ্বাপরে যুদ্ধ শক্তিশ্চ সঙ্ঘশক্তি কলৌযুগে।।
অর্থাৎ— ত্রেতাযুগে মন্ত্রশক্তি, সত্যযুগে জ্ঞানশক্তি, দ্বাপরযুগে যুদ্ধশক্তি আর কলিযুগে সঙ্ঘশক্তিতেই বিজয় লাভ সম্ভব। বর্তমানে দেশে বহু হিন্দু সংগঠন রয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এসব সংগঠন আংশিক সফল হলেও সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিষয়টি অনেকটা প্রবাদে কথিত—“নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো”। এই বাস্তবতা আমাদের আত্মসমীক্ষার দিকে আহ্বান জানায়।
তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ও ঐতিহাসিক ভুল
সংগঠনকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন তাত্ত্বিক প্রস্তুতি। সনাতন ধর্ম-দর্শন, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং অতীতের ভুলগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে জাতির জন্য কাজ করতে গিয়ে বারবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ইতিহাসে কিছু ভুল কেবল ভুল নয়—তা অমার্জনীয় অপরাধে পরিণত হয়। যেমন পৃথিবীরাজ চৌহান মোহাম্মদ ঘোরিকে ক্ষমা করে যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন, তার ফল আজও ভারতবর্ষ বহন করছে।
প্রকৃতি থেকে সংগঠনের শিক্ষা
সংগঠনের শিক্ষা নিতে হলে প্রকৃতিই হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ গুরু।
- পিঁপড়া: আমাদের শেখায় শৃঙ্খলা—সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছায়।
- কুকুর: শেখায় বিশ্বস্ততা—সে কখনো অকৃতজ্ঞ বা বিশ্বাসঘাতক হয় না।
- পায়রা: শেখায় স্বচ্ছতা—সে নোংরায় বাস করে না, নোংরা খাদ্য গ্রহণ করে না।
- গাধা: শেখায় নিরলস পরিশ্রম—নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যের কল্যাণ সাধন করে।
- ঘোড়া: শেখায় উদ্যম ও গতি—উদ্যম ছাড়া কোনো কাজই সফল হয় না।
- অজগর: শেখায় সংযম—সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহে ব্যস্ত হয় না।
- কাক: শেখায় একতা—একটি কাক বিপদে পড়লে সকল কাক একত্রিত হয়।
অথচ বাঙালি হিন্দু সমাজে এই চিত্র উল্টো। কেউ বিপদে পড়লে অনেকেই নিখোঁজ হয়ে যায়। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে হাত গুটিয়ে নেয়, কিন্তু নিজের ঘরে আগুন লাগলে তখন সবাইকে স্বার্থপর বলে দোষোরোপ করে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ যেমন, তার ফলও তেমনই পায়। মৌমাছির কাছ থেকে আমরা সমন্বিত প্রয়াসের শিক্ষা নিতে পারি। হাজার হাজার মৌমাছি একসাথে নিরলস পরিশ্রম করে একটি মধুচাক তৈরি করে। হিন্দু সমাজকেও তেমনই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে জাতি গঠনের পথে অগ্রসর হতে হবে।
ছাগপ্রবাহ বনাম শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা
দুঃখজনক সত্য হলো—বাঙালি হিন্দু সমাজ ‘গড্ডলিকা প্রবাহে’ নয়, বরং ‘ছাগপ্রবাহে’ চলে। ভেড়া দলবদ্ধভাবে অনুসরণ করে, কিন্তু ছাগল নিজের খেয়ালে ছুটে বেড়ায়। তাই ছাগলকে নিয়ে পথচলা কষ্টকর। অথচ শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করে বলেছেন—শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির আচরণই সমাজ অনুসরণ করে। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় বলা হয়েছে—
“শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা যেভাবে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষও তাই অনুসরণ করে।” (গীতা ৩.২১–২৩)
সাংগঠনিক ব্যর্থতার স্বরূপ
দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতায় একটি নির্মম সত্য বারবার চোখে পড়ে—
- যাদের মেধা আছে, তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা নেই।
- যাদের দক্ষতা আছে, তাদের বৈদিক জ্ঞান নেই।
- যাদের জ্ঞান আছে, তাদের বিনয় নেই।
- যাদের বিনয় আছে, তাদের সামর্থ্য নেই।
- যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের আগ্রহ নেই।
- যাদের আগ্রহ আছে, তাদের আত্মত্যাগ নেই।
ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। একতাবদ্ধ হতে না পারার ফলেই ব্যক্তি যেমন নিজের কল্যাণ করতে পারে না, তেমনি সমাজেরও ক্ষতি হয়। অনুকূল ঠাকুর যথার্থই বলেছেন— “এক আদেশে চলে যারা, তাদের নিয়েই সমাজগড়া।”
স্বামী প্রণবানন্দজীর বজ্রবাণী
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ যথার্থই বলেছেন— “হিন্দুর বিদ্যা আছে, বুদ্ধি আছে, অর্থ আছে—কিন্তু নেই একতা। এই সঙ্ঘশক্তি জাগ্রত হলেই হিন্দুজাতি অজেয় হয়ে উঠবে।” তিনি আরও বলেন— “যে দেহে একবিন্দু রক্ত থাকতে হিন্দুর ধর্ম, মান, ইজ্জত ও অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে না দেওয়ার শপথ নিতে পারে—সেই প্রকৃত রক্ষী।”
উপসংহার ও বেদের আহ্বান
আজ একমাত্র হিন্দু সমাজই বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষিত। অথচ ঋগ্বেদ আমাদের বারবার ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছে—
সং গচ্ছধ্বং সং বধ্বং সং বাে মনাংসি জানতাম্… (ঋগ্বেদ ১০.১৯১.২–৪)
অর্থাৎ—একসাথে চল, একসাথে চিন্তা কর, এক হৃদয়ে, এক মনে ঐক্যবদ্ধ হও। আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার, আত্মশুদ্ধির এবং সর্বোপরি ঐক্যের। কারণ—হিন্দুর যা কিছু আছে, তার মধ্যে শুধু একটাই নেই—একতা। আর সেই একতা ছাড়া কোনো জাতিরই টিকে থাকা সম্ভব নয়।
— লেখক: রঞ্জিত বর্মন
