জিজিয়া কর নয়, চাঁদাবাজির নিষ্ঠুর রাজনীতি: মনি চক্রবর্তীর নির্মম হত্যাকাণ্ড ও আধুনিক রাষ্ট্রের বিবেক
রঞ্জিত বর্মণ | বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতায় এমন কিছু শব্দ আছে যা শুনলে আজও মানুষের মনে আতঙ্ক আর বৈষম্যের ছবি ভেসে ওঠে। “জিজিয়া কর” তেমনই একটি শব্দ। মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থায় ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অমুসলিমদের ওপর যে সুরক্ষা কর চাপিয়ে দেওয়া হতো, আধুনিক গণতন্ত্রে তার কোনো স্থান থাকার কথা নয়। কিন্তু যখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের নরসিংদীতে একজন ব্যবসায়ীকে ‘কর’ না দেওয়ার অপরাধে প্রাণ দিতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি আসলে সভ্যতার পথে এগিয়েছি, নাকি মধ্যযুগীয় অন্ধকারের কোনো নতুন সংস্করণে প্রবেশ করছি?
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মনি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক সহনশীলতার এক বিরাট পরাজয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
১. প্রবাসের ঘাম এবং স্বদেশের রক্ত: মনি চক্রবর্তীর জীবন সংগ্রাম
মনি চক্রবর্তী ছিলেন সেই হাজারো প্রবাসীর একজন, যারা বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর বুকে কিংবা বিদেশের কোনো কারখানায় তিনি ঘাম ঝরিয়েছেন একটিই স্বপ্ন নিয়ে—একদিন নিজ গ্রামে ফিরে আসবেন, পরিবারের পাশে থাকবেন এবং মাথা উঁচু করে বাঁচবেন।
প্রবাস থেকে ফেরার পর তিনি চেয়েছিলেন নিজের এলাকায় একটি ব্যবসা দাঁড় করাতে। তিনি ভেবেছিলেন, স্বাধীন দেশে নিজের মাটিতে ব্যবসা করতে গিয়ে তাকে কোনো বাঁধার সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে, তার অর্জিত সঞ্চয়ই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। পলাশ এলাকায় তার সেই ছোট উদ্যোগটিই স্থানীয় একদল হায়েনার নজর কেড়ে নেয়। তারা তাকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং কেবল ‘অর্থ উপার্জনের মেশিন’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
২. চাঁদাবাজির নতুন মোড়ক: ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও নিপীড়ন
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী অপরাধী চক্র মনি চক্রবর্তীর কাছে ৫ লক্ষ টাকা দাবি করে। এই দাবির ধরণ ছিল ভয়ংকর। তারা সরাসরি এটিকে চাঁদা না বলে ‘জিজিয়া’ বা ‘সুরক্ষা ফি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এটি ছিল সরাসরি মনি চক্রবর্তীর ধর্মীয় সত্তার ওপর আঘাত। অপরাধীরা জানত যে, সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করা সহজ হবে।
যখন একজন ব্যবসায়ী এই অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, তখন শুরু হয় ধারাবাহিক হুমকি। মাসের পর মাস তাকে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি আইনের আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন কি না, নিলেও কেন নিরাপত্তা পাননি—এই প্রশ্নগুলো আজ জনমনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অপরাধীরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, তারা দিবালোকে মনি চক্রবর্তীকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। এই সাহস তারা কোথায় পায়?
৩. অপরাধের রাজনীতি নাকি রাজনীতির অপরাধ?
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধীরা কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় পায়। মনি চক্রবর্তীর হত্যাকারীরা যে কেবল ধর্মীয় উগ্রবাদী ছিল তা নয়, তাদের পেছনে স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক মদত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। চাঁদাবাজি যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঘটে, তখন তা সাধারণ অপরাধের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বা তাদের সম্পদ দখল করার ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা এক ধরণের ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তির স্বাদ পায়। মনি চক্রবর্তীর রক্ত আজ সেই দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আঙুল তুলছে। যদি এই অপরাধের সঠিক বিচার না হয়, তবে পলাশ উপজেলার মতো সারা দেশের অসংখ্য ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পাবেন।
৪. সংবিধান বনাম বাস্তবতা: কোথায় আমাদের সুরক্ষা?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হলেও, একইসাথে অন্যান্য ধর্মের মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে—কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ বা লিঙ্গের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে না।
তাহলে মনি চক্রবর্তী কেন বৈষম্যের শিকার হলেন? কেন তাকে তার অর্জিত সম্পদ রক্ষার জন্য জীবনের মূল্য দিতে হলো? রাষ্ট্র কি কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে সুরক্ষা দেয়? মনি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে থাকা অধিকার এবং বাস্তব জীবনের অধিকারের মধ্যে এক বিশাল মহাসমুদ্রের ব্যবধান রয়ে গেছে।
৫. সামাজিক বিবেকের পতন এবং আমাদের দায়
একটি এলাকায় যখন একজন মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা চাওয়া হয় এবং তাকে হুমকি দেওয়া হয়, তখন সমাজের অন্যান্য মানুষ কেন নিরব থাকে? মনি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার ফল। আমরা যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুলে যাই, তখন অপরাধীরা আরও রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে।
স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আবশ্যক। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন এই অপরাধী চক্রের তৎপরতা আগে থেকে টের পেল না? পলাশের মতো একটি ছোট জনপদে যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে অপরাধীরা কীভাবে পালিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখায়?
৬. জিজিয়া করের মিথ্যা প্রচারণা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
যারা এই চাঁদাবাজিকে ‘জিজিয়া’ বলে প্রচার করছে, তারা মূলত ইসলামের অপব্যাখ্যা করছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে প্রতিটি নাগরিক কর (Tax) প্রদান করেন, সেখানে আলাদা করে কোনো ধর্মীয় কর থাকতে পারে না। অপরাধীরা তাদের হীন অপরাধকে একটি ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মাত্র। এদের মূল উদ্দেশ্য ধর্ম পালন নয়, বরং লুটতরাজ। এই সন্ত্রাসীদের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নেই—এদের পরিচয় শুধুই সন্ত্রাসী।
বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান দীর্ঘকাল ধরে একসাথে বসবাস করে আসছে। মনি চক্রবর্তীর মতো একজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু এই সহাবস্থানের মূলে কুঠারাঘাত। এই অপরাধীদের রুখতে না পারলে সমাজের সাম্প্রদায়িক বুনন ছিঁড়ে যাবে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
৭. ন্যায়বিচারের দাবি: রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা
মনি চক্রবর্তী হত্যার বিচার কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার পরীক্ষা। আমরা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবিগুলো পেশ করছি:
- দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: এই মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে হবে এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
- ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: মনি চক্রবর্তীর পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- চাঁদাবাজি বিরোধী বিশেষ অভিযান: পলাশসহ সারা দেশে সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজির যে অদৃশ্য সিন্ডিকেট রয়েছে, তা গুঁড়িয়ে দিতে বিশেষ চিরুনি অভিযান চালাতে হবে।
- উস্কানিদাতাদের বিচার: যারা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করে চাঁদাবাজিকে উসকে দিচ্ছে, তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
উপসংহার: মনি চক্রবর্তীর রক্ত বৃথা যেতে পারে না
মনি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা কতটুকু অনিরাপদ। আজ মনি চক্রবর্তী গেছেন, কাল হয়তো আপনার বা আমার পালা। এই নিষ্ঠুর রাজনীতির অবসান না হলে দেশ মেধাশূন্য এবং সম্পদশূন্য হয়ে পড়বে। কোনো সুস্থ মানুষ এমন অনিরাপদ পরিবেশে নিজের পুঁজি বিনিয়োগ করতে চাইবে না।
আমরা জিজিয়া করের সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চাই না। আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে মনি চক্রবর্তীরা প্রবাস থেকে ফিরে নির্ভয়ে নিজের ভিটেমাটিতে ব্যবসা করতে পারবেন। যেখানে কোনো মা-কে তার ছেলের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বিলাপ করতে হবে না।
এটি জিজিয়া কর নয়—এটি বর্বরতা।
এটি ধর্ম নয়—এটি সন্ত্রাসবাদ।
আমরা মনি চক্রবর্তী হত্যার চূড়ান্ত বিচার চাই।
