স্বামী বিবেকানন্দ, জীবিত সাধুর অবহেলা, মৃত সাধুর বন্দনা

জীবিত সাধুর অবহেলা, মৃত সাধুর বন্দনা — সমাজের নির্মম বাস্তবতা

বাংলা প্রবাদ “উড়িলে সাধুর ছাই, তবেই সাধুর গুণ গাই”—এটি কেবল একটি কথামাত্র নয়; এটি সমাজের আয়না। আমরা এমন এক মানসিকতার মধ্যে বাস করি, যেখানে জীবিত গুণী মানুষকে আমরা তুচ্ছ করি, উপহাস করি, অবহেলা করি; কিন্তু তিনি মারা গেলে ফুল, মালা ও বক্তৃতায় তার প্রশংসায় মেতে উঠি। এই দ্বিচারিতা শুধু সমাজের নয়, প্রায় প্রতিটি মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা এক কঠিন সত্য।

প্রবাদের গভীর অর্থ

“উড়িলে সাধুর ছাই” কথাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে মৃত্যুকে। অর্থাৎ, কোনো মানবিক সাধু, কবি, শিল্পী বা মহৎপ্রাণ মানুষ মারা গেলে তার নাম রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়। অথচ জীবিত অবস্থায় তার কোনো মূল্য থাকে না। আমরা তাকে বুঝতে পারি না, কিংবা বুঝেও বুঝি না। তার চিন্তা, তার অভিপ্রায়, তার কাজ—সবকিছু আমাদের স্বার্থপর সমাজের বেড়াজালের বাইরে বলে আমরা তাকে সহজে গ্রহণ করি না।

সাধুর কর্ম কেন সমাজ বোঝে না

একজন মহৎপ্রাণ মানুষ সবসময় কাজ করেন পরার্থে, নিজের জন্য নয়। তিনি সমাজের কল্যাণে নিবেদিত থাকেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ নিজের লাভ‑ক্ষতি, মর্যাদা ও প্রতিপত্তির ঘেরাটোপে বন্দি। তাই যখন কোনো সাধু বা চিন্তাবিদ তাদের চিন্তাকে নতুনভাবে রূপ দিতে চান, তখন সমাজের কিছু লোক তাকে প্রতিপক্ষ মনে করে। অসাধারণ চিন্তা সবসময় বিরোধিতা আহ্বান করে, কারণ তা প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের বিপরীতে দাঁড়ায়।

সচেতন সমাজচিন্তার এই অসঙ্গতি থেকেই জন্ম নেয় সেই আচরণ, যেখানে মানুষ জীবদ্দশায় সমালোচনার শিকার হন, আর মৃত্যুর পরে প্রশংসার জয়ধ্বনি ওঠে।

শাস্ত্রে সাধুর লক্ষণ

শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে ভগবান কপিল দেবাহূতি দেবীকে বলেছেন—যিনি সহিষ্ণু, করুণাময়, শান্ত স্বভাবের এবং সকল জীবের কল্যাণে নিবেদিত, তিনিই প্রকৃত সাধু। তিনি কারও প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন না এবং কারও প্রশংসায় মোহগ্রস্ত হন না। তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানবতার সেবা ও পরম সত্যের উপলব্ধি।

এমন মানুষ যখন সমাজে জন্ম নেয়, তখন তার উপস্থিতি অগণিত মানুষকে নাড়া দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সমাজের কুটিল অধিবাসীরা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সেই সাধুকেই অবমাননা করতে পিছপা হয় না।

অপমানের পরিণতি: শাস্ত্রের সতর্কবাণী

শাস্ত্র বলছে—যে ব্যক্তি অকারণে মহাত্মাকে অসম্মান করে, তার আয়ু, যশ, ঐশ্বর্য ও ধর্ম ধ্বংস হয়ে যায়। হিরণ্যকশিপুর উদাহরণই তার প্রমাণ। অসীম শক্তির অধিকারী হয়েও প্রহ্লাদের ভক্তি সহ্য করতে না পেরে সে ধ্বংস হয়েছিল। কারণ মহাত্মাকে অবমাননা ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধিতা করা।

বিষ্ণুপুরাণ আরও বলছে—কুটিলচিত্ত মানুষের সঙ্গ সর্বনাশ ডেকে আনে, আর সাধুজনের সঙ্গ ক্ষণিকের হলেও অনন্ত ফল দেয়। কিন্তু আমরা বিপরীত করি। কুটিলের প্রশংসা করি, আর সাধুর প্রতি সন্দেহ জাগাই।

ধর্ম মানে আচার নয়, চরিত্র

মহাভারতের অনুশাসন পর্বে বলা হয়েছে—ধর্ম কোনো গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়; ধর্ম প্রকাশ পায় মহৎপ্রাণ মানুষের আচরণে ও সদাচারে। অর্থাৎ, প্রকৃত ধর্মীয়তা প্রকাশ পায় সেইসব মানুষের জীবনে, যারা অন্যের মঙ্গল কামনা করেন নিঃস্বার্থভাবে। একজীবন কর্মের মধ্যেই ধর্মের প্রকৃতি ফুটে ওঠে।

সমাজের কুদৃষ্টি: গুণীর অবহেলা

আমাদের সমাজে এক গভীর অসামঞ্জস্য রয়েছে—জীবিত গুণী মানুষ তুচ্ছ, মৃত গুণী মানুষ মহিমান্বিত। আমরা তার জীবদ্দশায় সমর্থনের বদলে সমালোচনা দিই, তাঁর সংগ্রামের সময় পাশে দাঁড়াই না, কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী শ্রদ্ধাঞ্জলিতে ভিড় জমাই।

কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, আধ্যাত্মিক গুরু—সব ক্ষেত্রেই এই একই চিত্র দেখা যায়। তিনি যখন নতুন চিন্তা দেন, আমরা সন্দেহ করি। আর যখন তিনি চলে যান, তখন তাঁরই উক্তি উদ্ধৃত করে বক্তৃতা দিই।

স্বামী বিবেকানন্দ: জীবনে অবহেলা, মৃত্যুর পরে শ্রদ্ধা

স্বামী বিবেকানন্দ এই প্রবাদের এক জীবন্ত ব্যাখ্যা। জীবিত অবস্থায় তিনি ছিলেন বিতর্কিত, সমাজে কেউ তাঁকে সমর্থন করেনি। অনেকেই তাঁর বিদেশযাত্রা, বক্তৃতা ও সংস্কারমূলক চিন্তাকে ভালোভাবে নেয়নি। এমনকি মৃত্যুর পরেও বেলুড় মঠে তাঁর দাহকার্যে বাধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ সেই স্থান বিশ্বজুড়ে শান্তি, জ্ঞান, ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।

এই একটাই সত্য বারবার ফেরত আসে—জীবিত সাধু অবহেলিত, মৃত সাধু মহান। বিবেকানন্দের মৃত্যু হলেও তাঁর ভাবধারা আজ আরও প্রখর; তাঁর চিন্তা বাঙালি সমাজে আত্মমর্যাদা, সাম্য ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কেন আমরা জীবিত অবস্থায় মূল্য দিই না?

এর উত্তর আমাদের সামাজিকভাবে গঠিত মানসিকতায় লুকিয়ে আছে। জীবিত মানুষ ভুল করতে পারেন, তাই তাঁকে বিচার করা সহজ। মৃত মানুষ বিচারহীন হয়ে পড়েন, তাই আমরা তাঁকে প্রশংসা করি। তাছাড়া, জীবিত মানুষ আমাদের সামনে আছেন—তাঁর সাফল্য অনেককে ঈর্ষান্বিত করে। মৃত্যুর পর সে ভয় থাকে না, তাই শ্রদ্ধা বাড়ে।

তবে এই অভ্যাস মানবজাতির বিকাশে প্রতিবন্ধক। কারণ গুণী মানুষদের কর্মে উৎসাহ না দিলে সমাজ উন্নতি করে না। আমরা যদি জীবিত অবস্থায় তাঁদের সম্মান দিই, তবে তাঁরাই সমাজকে আরও এগিয়ে নিতে পারেন।

সচেতনতার শিক্ষা: সময় থাকতে মূল্যায়ন করুন

আমরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না। দাঁত পড়ে গেলে পিছনে কাঁদি। একইভাবে, একজন আদর্শ মানুষ, একজন চিন্তাবিদ বা সাধু মারা গেলে তাঁর মূল্য উপলব্ধি করি। কিন্তু তখন দেরি হয়ে যায়। তাই প্রয়োজন এখনই—যাঁরা মানবিক, যাঁরা সমাজের জন্য কাজ করছেন, তাঁদের কাছে গিয়ে বলা “তুমি আছো বলে সমাজ সুন্দর”।

জীবিত অবস্থায় সম্মান দেওয়া মানে শুধু তাঁর মনোবল বাড়ানো নয়, সমাজের উন্নতিও নিশ্চিত করা। কারণ, গুণী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানেই হলো সভ্যতার পাশে দাঁড়ানো।

সময় ও সমাজের পরিবর্তন দরকার

আজকের সমাজে সফলতা মাপা হয় অর্থ ও খ্যাতির পরিমাপে। কিন্তু একজন সাধুর মাপ সেগুলোর বাইরে। তিনি মাপা যায় দয়া, সহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেমের মানদণ্ডে। যখন আমরা অর্থের পরিবর্তে আদর্শকে মূল্য দিতে শিখব, তখনই এই প্রবচনের অর্থ বদলে যাবে।

তখন আর বলা হবে না—“উড়িলে সাধুর ছাই, তবেই সাধুর গুণ গাই।” বলা হবে—“জীবিত সাধুর গুণ বুঝি, তবেই সমাজের জয়গান গাই।”

শেষ কথা

মানুষের প্রকৃতি এমন যে, সে হারিয়ে বুঝতে শেখে মূল্য। কিন্তু আমাদের উচিত সেই শিক্ষা আগে নেওয়া। সমাজ যদি জীবিত অবস্থায় গুণী মানুষদের সম্মান দিতে শিখে, তবে সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও মানবতার নতুন জাগরণ ঘটবে।

তাই আসুন—আজ থেকেই শপথ করি, সাধু বা গুণী মানুষ যখন আমাদের মাঝে আছেন, তখনই তাঁর গুণের প্রশংসা করি; মৃত্যুর পরে নয়, জীবিত অবস্থাতেই তাঁকে ভালোবাসি।

লেখক: রঞ্জিত বর্মন — সমাজচিন্তক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Comment