রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুন: সিদ্ধার্থের বাবার সাক্ষাৎকার, পুলিশের তদন্ত ও নানা ধোঁয়াশা

রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ ও নাড়া দিয়েছে। এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ, পুলিশের তদন্তের বয়ান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং বিশেষ করে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবার দেওয়া সাক্ষাৎকারটি ঘিরে দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন, কৌতূহল ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশের তদন্ত ও চাঞ্চল্যকর বয়ান

রংপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন থেকে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। বাড়ির মালিক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি টের পেয়ে ছাদে গিয়ে বাধা দিলে তাঁকে প্রথমে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর চিৎশব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ছুটে এলে একে একে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ছোট ছেলে আয়ুশকেও শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যাতে তাদের পরিচয় বা অপরাধের বিষয়টি ফাঁস হয়ে না যায়।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, চাঞ্চল্যকর এই খুনের পর অপরাধ ঢাকতে ঘরের আলমারি ও ড্রায়ার তছনশ করে জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়, যাতে ঘটনাটিকে একটি নিছক ডাকাতি বলে মনে হয়। এমনকি খুন করার পর অভিযুক্তরা ওই বাড়িতেই বাথরুমে গোসল করে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খায় এবং পুনরায় ইয়াবা সেবন ও জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে নিহতের বড় ভাই কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করার পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করে। গত রোববার সন্ধ্যায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁদের হাজির করা হলে বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে তাঁরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সিদ্ধার্থের বাবার সাক্ষাৎকার ও চাঞ্চল্যকর তথ্য

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবার একটি সাক্ষাৎকার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পুলিশ যখন সিদ্ধার্থকে খুঁজতে তাঁর বাসায় যায়, তখন সে নিজ ঘরে ছিল না; বরং তার কাকার বাসায় ঘুমাচ্ছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর বাবা নিজে পুলিশের সাথে গিয়ে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—কেউ কি এত বড় একটি নৃশংস ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কোথাও পালিয়ে না গিয়ে নিজ এলাকায় এভাবে নিজ বাসায় বা কাকার বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে? এটি কি কোনোভাবে বাস্তবসম্মত বা সম্ভব?

এছাড়া সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর বাবা-মা উভয়েই গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেছেন যে, তাদের ছেলেরা কোনো ধরনের নেশা বা অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত নয়। এ বিষয়ে এলাকাবাসী ও আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে দেখার জন্যও তাঁরা অনুরোধ জানান। তবে এই ঘটনা সত্যি কি না বা তাঁদের ছেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিদ্ধার্থের বাবা চরম হতাশা ও নিরূপায় প্রকাশ করে জানান, “এখানে তো আমার করণীয় কিছু নাই, পুলিশ যা বলবে সেটাই সঠিক।” তাঁর এই বক্তব্যটি তদন্তের মোড় ও সাধারণ মানুষের ভাবনায় নতুন খোরাক জুগিয়েছে।

পরিবার, এলাকাবাসী ও অপরাধবিজ্ঞানের প্রশ্ন

এদিকে জোড়া বা চারিত্রিক এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মাত্র দুই তরুণ একা জড়িত থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী। নিহত গণপতির স্বজন ও প্রতিবেশীদের মতে, শারীরিক গঠন বা বয়সের দিক থেকে এই যুবকদের পক্ষে একা চারজন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেওয়া বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য, পূর্ব শত্রুতা কিংবা অন্য কোনো চক্রের হাত রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোরালো দাবি উঠেছে। অন্যদিকে অভিযুক্তদের পরিবারও তাঁদের সন্তানরা এমন পৈশাচিকতা ঘটাতে পারে বলে সহজে বিশ্বাস করতে চাইছে না।

বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি পদক্ষেপ

গত শনিবার রাতে পুলিশ কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে রবিবার রাতে নগরীর মহাশ্মশানে পাশাপাশি চার চিতায় চারজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়, যা পুরো এলাকায় এক গভীর শোকের ছায়া ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। আসামিরা আদালতে নিজেদের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ায় পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করেনি, তবে এই ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না এবং প্রকৃত মোটিভ কী ছিল, তা উদ্ঘাটনে পুলিশি তদন্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।

লেখক = রঞ্জিত বর্মন