খালেদা জিয়ার জানাজা ও হাদি হত্যার বিচার দাবি

বিশেষ সংবাদ | খালেদা জিয়ার জানাজা ও হাদি হত্যার বিচার দাবি
জাতীয় সংবাদ

বিদায় ‘আপসহীন’ নেত্রী: জনসমুদ্রে খালেদা জিয়ার জানাজা, নেপথ্যে হাদি হত্যার বিচার ও ন্যায়ের গর্জন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

আজকের ঢাকা যেন ছিল এক নিস্তব্ধ অথচ প্রতিবাদী মিছিলের শহর। একদিকে দেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানানোর শোকাতুর পরিবেশ, অন্যদিকে রাজপথে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাহসী যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবিতে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ। শোক এবং ন্যায়ের লড়াই—এই দুই সমান্তরাল আবেগ আজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল রাজধানী ঢাকার রাজপথে। মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শুরু করে আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ—প্রতিটি মোড়ে মানুষের মুখে ছিল একটিই উচ্চারণ, ‘শোককে শক্তিতে রূপান্তর করো, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করো’। সাংবাদিক, ছাত্র, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামের সরল কৃষক—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আজকের ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক জনমঞ্চে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশজুড়ে ঘোষিত জাতীয় শোক শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি টানেনি, বরং গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাসের পরিসমাপ্তি টেনে দিয়েছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যেমন একদিকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি অন্যদিকে সামরিক শাসন, একদলীয় আধিপত্য আর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতময় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন। তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির মামলাকে ঘিরে দেশ-বিদেশে যেভাবে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তেমনি অসুস্থতা, শারীরিক কষ্ট আর দীর্ঘ গৃহবন্দী জীবনের মধ্যেও তিনি আপসহীনতার প্রতীক হিসেবেই হাজির ছিলেন তার সমর্থকদের কাছে। তার মৃত্যুতে আজ যারা জানাজায় উপস্থিত হয়েছেন, তাদের অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্র তার প্রতি ন্যায়বিচার দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।

জনসমুদ্রে পরিণত মানিক মিয়া এভিনিউ

সকাল থেকেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে ছিল মানুষের ঢল। ফেনী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বগুড়া, রাঙামাটি থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল তাদের প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে। অনেকেই রাতভর বাস, ট্রেন কিংবা পিকআপে ভ্রমণ করে ভোরে ঢাকায় পৌঁছে সরাসরি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দিকে রওনা দেন। কেউ হাতে কালো ব্যাজ, কেউ বা বিএনপি ও লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন সড়কের দুই পাশে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক জুড়ে তৈরি হয় মানবসাগর; সংসদ ভবনের চারপাশের প্রতিটি সড়ক তখন নিরাপত্তা বলয় ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে পরিণত হয় অপ্রবেশ্য অঞ্চলে।

বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউতে যখন জানাজা শুরু হয়, তখন সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রার্থনার সারি সংসদ ভবনের গেট ছাড়িয়ে দূর পর্যন্ত চলে যায়। বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক জানাজা পরিচালনা করেন এবং খুতবার আগে সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ, কারাবরণ এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে তার অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। দোয়ার সময় তিনি বিশেষভাবে দেশের স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং হত্যা-গুমসহ অতীত অন্যায়ের বিচার চেয়ে মোনাজাত করেন।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা। তারা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন,

আরও পড়ুন: হবিগঞ্জে পুলিশ হত্যা ও শরীয়াহ আইনের প্রতিফলন

আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার ভূমিকাসহ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। জানাজার আগে ড. ইউনুস সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে বলেন, খালেদা জিয়ার মতো নেতারা ভুলে যাওয়ার নন, তারা ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন এবং নতুন প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেন। বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও নজরকেও স্পষ্ট করে।

জানাজা শেষ হওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহ রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানের উদ্দেশে নেওয়া হয়, যেখানে পূর্ব থেকেই তার স্বামী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর অবস্থিত। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, গার্ড অব অনার ও ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তাকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, নারী নেত্রী এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহযোদ্ধারা অশ্রুসজল কণ্ঠে তার বিদায়ে দোয়া প্রার্থনা করেন। অনেকেই বলছিলেন, এক যুগপৎ ইতিহাসের—স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতির আর একটি পুরো অধ্যায়ের—দরজা আজ বন্ধ হয়ে গেল।

“খালেদা জিয়া আমাদের জন্য শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার ভুল থাকতে পারে, কিন্তু তার সাহস, কারাবরণ আর আপসহীন অবস্থান আমাদের বারবার রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করেছে।” — জানাজায় আসা এক শোকাহত সাধারণ নাগরিক।

শোকের আবহে ‘হাদি হত্যার’ বিচারের দাবি

বেগম জিয়ার জানাজা যখন ধর্মীয় গাম্ভীর্যে সম্পন্ন হচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড়ের ভেতর থেকে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল একটি দাবি—“শহীদ হাদির রক্ত, বৃথা যেতে দেব না!” জুলাই বিপ্লবের সম্মুখযোদ্ধা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আজ উত্তাল ছিল জনতা। অনেকে হাতে নিয়ে এসেছিলেন হাদির ছবি, কেউবা প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন—‘আজকের শোক, আগামীর প্রতিরোধ’, ‘খালেদার ন্যায়বিচার পাইনি, হাদির ন্যায়বিচার কেড়ে নেব’। জানাজার ময়দানে শোকের নীরবতার ফাঁক গলে যখনই স্লোগান ওঠে, তখনই চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয় ‘ইনসাফ, ইনসাফ’ ধ্বনি।

আন্দোলনরত সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ জানায়, তারা আজ তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত করে জানাজায় অংশ নিয়েছে। তবে তাদের দাবি স্পষ্ট—আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হাদির খুনিদের বিচার করতে হবে। সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পরেও পুরনো প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক অংশ এখনো সক্রিয়, যারা গোপনে হাদিসহ তরুণ নেতাদের টার্গেট করছে। তাদের ভাষায়, ‘জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্ম, সেই সরকারের একটিই পরীক্ষা—হাদির হত্যার বিচার’।

হাদির পরিবারও আজ রাজধানীতে আয়োজিত এই জানাজায় প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। হাদির মা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘একজন মা হিসেবে আমি বিচার চাই, প্রতিশোধ না, কিন্তু সেই বিচার হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং জনসম্মুখে।’ পরিবারের অভিযোগ, হামলার পর হাদিকে দ্রুত বিদেশে পাঠাতে দেরি করা হয়েছে এবং তদন্তের প্রাথমিক ধাপেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে সমাবেশ করে হাদির হত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলবেন এবং প্রয়োজনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে যাবেন, যদি সরকার তাদের দাবির প্রতি সাড়া না দেয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে হাদির হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে এবং ঢাকার কূটনৈতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। ইনকিলাব মঞ্চের অভিযোগ, যারা অতীতে গণহত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, সেই শক্তিগুলোই এখন আড়ালে থেকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে নির্মূলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান ও ইনকিলাব মঞ্চের উত্থান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা রূপ নেয় সর্বাত্মক গণবিপ্লবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া এই ছাত্রআন্দোলন যখন সরকারের দমন-পীড়ন, গুলি ও হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়, তখন সাধারণ মানুষও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। কয়েক সপ্তাহের টানা সহিংসতা, শতাধিক প্রাণহানি এবং হাজারো আহত-গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পতন ঘটে এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্ম হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই সময়েই ইনকিলাব মঞ্চ নামের প্ল্যাটফর্মটি সামনে আসে, যার মুখপাত্র হিসেবে উত্থান ঘটে শরিফ ওসমান হাদির। তরুণদের ভাষায় কথা বলার ক্ষমতা, অগ্নিগর্ভ বক্তব্য এবং ইসলামী ন্যায়বিচার-ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাকে আধুনিক গণতন্ত্রের ভাষায় উপস্থাপন করার দক্ষতার কারণে অল্প সময়েই তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। হাদি শুধু রাজপথের নেতা ছিলেন না; তিনি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেরও এক মুখ। কবিতা, কাওয়ালি, গণসংগীত—এসবের মাধ্যমে তিনি অবিচারের বিরুদ্ধে ‘শহীদির অঙ্গীকার’কে নতুনভাবে সামনে এনেছিলেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইনকিলাব মঞ্চ জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ক্ষমতার রূপরেখা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছে, যা পুরনো দলীয় রাজনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে।

অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও বহু কাঠামোগত সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ইনকিলাব মঞ্চ বারবার বলেছে, শুধু সরকার বদলালেই হবে না, বরং বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে যে গভীর বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে দিতে হবে। হাদি নিজেও একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তবে তার প্রথম শর্ত হচ্ছে ন্যায়বিচারের অবকাঠামো পুনর্গঠন।’ এই প্রেক্ষাপটে তার হত্যাকাণ্ড অনেকের চোখে প্রতিশোধমূলক এবং রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, যা ভয় দেখিয়ে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠরোধের চেষ্টা।

রাজনীতির নতুন মেরুকরণ?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আজকের এই বিশাল জনসমাগম কেবল একটি জানাজা ছিল না, এটি ছিল জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে যেখানে জাতীয় শোক বিরাজ করছে, সেখানে হাদি হত্যার বিচার দাবি সরকারকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে অতীতের দুই ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে নতুন উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখনকার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বাইরে গড়ে ওঠা ছাত্র-যুবভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো আগামী দিনের রাজনীতির মূল খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চ, জুলাইয়ের ছাত্রনেতৃবৃন্দ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা একসঙ্গে যদি একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে। আবার অন্য একটি অংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত মেরুকরণ এবং প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের নতুন সূচনা অচিরেই অস্থিরতায় নিমজ্জিত হতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সামনে এখন দুই ধরনের প্রত্যাশা। একদিকে আন্তর্জাতিক মহল চায়, তিনি দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেবেন; অন্যদিকে রাজপথের তরুণ শক্তি ও শহীদ হাদির অনুসারীরা চাইছে, নির্বাচনসহ সবকিছুর আগে হোক সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। এই দ্বি-মাত্রিক চাপের মাঝখানে আগামী কয়েক মাসে তার নেওয়া সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে—বাংলাদেশ সত্যিই ‘দ্বিতীয় মুক্তি’র পথে হাঁটবে, নাকি পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে।

আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। একদিকে এক মহীয়সী নেত্রীর বিদায়, অন্যদিকে এক নতুন তারুণ্যের ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই—সব মিলিয়ে ২০২৫-এর শেষ দিনটি ঢাকার আকাশে এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে আগামীর প্রত্যাশার বার্তা রেখে গেল। মানিক মিয়া এভিনিউতে বয়ে যাওয়া হাওয়ায় মিশে ছিল এক যুগের বিদায় এবং নতুন যুগের সূচনার সংকেত। যারা আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, স্লোগান দিচ্ছিলেন কিংবা নীরবে মোনাজাত করছিলেন—তাদের সবারই মনের কথা যেন একটাই, ‘আর কোনো হাদি, আর কোনো গুম-হত্যা নয়; এবার দরকার সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র।’

Leave a Comment