হবিগঞ্জে পুলিশ হত্যা ও শরীয়তপুরে ব্যবসায়ীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি কি গ্রাস করছে সমাজকে?
নিজস্ব প্রতিবেদক: রঞ্জিত বর্মন | প্রকাশিত: ২ জানুয়ারি, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের দুটি পৃথক জেলায় ঘটে যাওয়া নৃশংসতা দেশের বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা সন্তোষ চাকমাকে বর্বরোচিতভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং শরীয়তপুরে ঔষধ ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে শরীরে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা—এই দুটি ঘটনাই বর্তমান সময়ের চরম অরাজকতা ও মানবিক অবক্ষয়ের জীবন্ত দলিল। একদিকে রাষ্ট্রীয় সেবকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকের জানমালের চরম অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
১. বানিয়াচং থানায় হামলা ও এসআই সন্তোষ হত্যাকাণ্ড: একটি কালো অধ্যায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু সেই দিনটি হবিগঞ্জের বানিয়াচংবাসীর কাছে আজীবন কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। বিক্ষুব্ধ জনতা যখন বানিয়াচং থানায় আক্রমণ চালায়, তখন সেখানে অনেক পুলিশ সদস্য আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) সন্তোষ চাকমা।
নারকীয় উল্লাস ও পৈশাচিকতা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা সন্তোষ চাকমাকে একা পেয়ে অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। তাকে পিটিয়ে মৃতপ্রায় করার পর অত্যন্ত পৈশাচিক কায়দায় তাঁর মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তার সাথে এই ধরনের আচরণ মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং আইনের শাসনের ওপর এক চরম আঘাত।
ভাইরাল ভিডিও ও দম্ভোক্তির স্বীকারোক্তি
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক যুবক পুলিশের উপস্থিতিতেই সদম্ভে ঘোষণা করছেন যে, তাঁরাই এসআই সন্তোষকে হত্যা করেছেন এবং থানায় আগুন দিয়েছেন। এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি সমাজকে একটি ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে: “আমরা আইন ভাঙতে পারি এবং তা নিয়ে দম্ভও করতে পারি।”
২. শরীয়তপুরে খোকন দাসের ওপর হামলা: জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক ব্যবসায়ী
হবিগঞ্জের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শরীয়তপুর থেকে আসে আরও এক লোমহর্ষক খবর। সেখানকার ঔষধ ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসের ওপর চালানো হয়েছে পরিকল্পিত হামলা। ঘটনার মূল হোতা হিসেবে রাব্বি মোল্লা নামে এক যুবকের নাম উঠে এসেছে।
পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, রাব্বি মোল্লা ও তার সহযোগীরা খোকন দাসকে ঘিরে ধরে প্রথমে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি তারা; খোকন দাসের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যাতে তাঁর মৃত্যুর প্রমাণ লোপাট করা যায়। বর্তমানে খোকন দাস ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন। তাঁর শরীরের বড় একটি অংশ দগ্ধ হওয়ায় অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
৩. কেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাড়ছে? (একটি গভীর বিশ্লেষণ)
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো অপরাধী মনে করে যে সে রাজনৈতিক পরিচয় বা ভিড়ের আড়ালে পার পেয়ে যাবে, তখনই এই ধরনের নৃশংসতা বৃদ্ধি পায়।
- তদন্তের ধীরগতি: বানিয়াচংয়ের ঘটনায় মামলা হলেও এখনো মূল হোতাদের গ্রেফতারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
- রাজনৈতিক ঢাল: অপরাধীরা প্রায়ই আন্দোলনের বা কোনো সংগঠনের ‘সমন্বয়ক’ বা ‘সক্রিয় কর্মী’ পরিচয় ব্যবহার করে আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে চাইছে।
- সামাজিক অস্থিরতা: দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
৪. স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
শরীয়তপুর ও হবিগঞ্জ—উভয় জেলাতেই সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ঔষধ ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে খোকন দাসের ওপর হামলার বিচার চেয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সহকর্মীর মৃত্যু এবং খুনিদের প্রকাশ্য আস্ফালন এক ধরনের নীরব ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পুলিশের ওপর হামলা এবং সাধারণ নাগরিককে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা—উভয়ই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তারা বলছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু থাকবে না।
৫. সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা
জনগণ চায় না আর কোনো সন্তোষ চাকমার মৃতদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে, বা কোনো খোকন দাসকে আগুনে পুড়ে মরতে। সরকারের কাছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কয়েকটি জোরালো দাবি উঠেছে:
- নিরপেক্ষ তদন্ত: কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে।
- নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: থানা ও সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি সাধারণ ব্যবসায়ীদের জানমালের নিরাপত্তা জোরদার করা।
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: খুনি ও অগ্নিসংযোগকারীদের এমন শাস্তি দিতে হবে যা ভবিষ্যতে অন্যদের এই ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখে।
উপসংহার
হবিগঞ্জ ও শরীয়তপুরের এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশের আইনের শাসনের জন্য এক বড় পরীক্ষা। এসআই সন্তোষ চাকমা হত্যাকাণ্ডের খুনিরা এবং খোকন দাসের ওপর হামলাকারী রাব্বি মোল্লারা যদি বিচারের বাইরে থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আমরা একটি সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে এবং কোনো অপরাধীই পার পাবে না।
বি.দ্র.: এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন বিশ্বস্ত সংবাদ মাধ্যম ও স্থানীয় প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। ঘটনার পরবর্তী আপডেট জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।
