হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হওয়ায় ঠাঁই হয়নি পরিবারে—মা/রা যাওয়ার পর লা/শও নিলো না আপনজনরা!

ধর্ম পরিবর্তন ও পারিবারিক বিচ্ছেদ: ঝিনাইদহের যাট বাড়িয়া গ্রামের এক মানবিক বিপর্যয়ের আখ্যান

প্রতিবেদন: রঞ্জিত বর্মণ | বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন / সমাজ


আমাদের আধুনিক সমাজে ধর্মের সংজ্ঞা যতটা না আধ্যাত্মিক, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক পরিচয়ের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝিনাইদহ পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ডের যাট বাড়িয়া গ্রামের সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল একজন মানুষের ধর্ম পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এক দীর্ঘ দুই দশকের একাকীত্ব, সামাজিক বঞ্চনা এবং রক্তের সম্পর্কের পরাজয়ের এক করুণ আখ্যান।

দুই দশকের একাকীত্ব: একটি সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য

ঘটনার সূত্রপাত প্রায় ২০ বছর আগে। যাট বাড়িয়া গ্রামের জনৈক এক ব্যক্তি নিজের বিশ্বাস থেকে সনাতন হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। আমাদের দেশে সংবিধান ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিলেও, সমাজ ও পরিবার অনেক ক্ষেত্রেই তা সহজভাবে নিতে পারে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধর্ম পরিবর্তনের খবর পাওয়ার পরপরই পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। সেই দিন থেকেই শুরু হয় তার বিচ্ছিন্ন জীবনের সংগ্রাম। যে মা-বাবা এবং ভাই-বোনদের সাথে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তনের কারণে তারাই তাকে চিরতরে ‘পর’ করে দেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কয়েকবার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানায় যখন পরিবার নিখোঁজ

গত ২৬ ডিসেম্বর (শুক্রবার) সেই নিঃসঙ্গ জীবনের সমাপ্তি ঘটে। বার্ধক্যজনিত বা অসুস্থতার কারণে তার মৃত্যুর সংবাদ যখন পরিবারের কাছে পৌঁছানো হয়, তখন সবাই আশা করেছিল হয়তো মৃত্যুর পর সব বিভেদ ভুলে তাকে আপন করে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর।

পরিবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, যে ব্যক্তি তাদের ধর্ম ত্যাগ করেছেন, তার লাশের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি শেষবারের মতো তাকে দেখার জন্য কোনো সদস্য হাসপাতালে বা ঘটনাস্থলে আসেননি। ফলে জীবদ্দশায় যেমন তিনি আপনজনহীন ছিলেন, নিথর দেহ নিয়েও তাকে দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকতে হয় এককভাবে।

বেওয়ারিশ হিসেবে শেষ বিদায়: আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ভূমিকা

যখন রক্তের সম্পর্ক হার মেনে যায়, তখন রাষ্ট্র ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানই শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। ঝিনাইদহ সদর থানা লাশটি গ্রহণ করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো অভিভাবক না পাওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সেটিকে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

পরবর্তীতে লাশটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইসলামের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হলেও সেখানে ছিলেন না কোনো রক্তের আত্মীয়। এই দৃশ্যটি ঝিনাইদহের জনমনে এক গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—ধর্মীয় বিশ্বাস কি এতটাই বড় যে তা মানবিক মমতাকে আড়াল করে দেয়?

সংবিধান বনাম সামাজিক ট্যাবু: একটি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র এই অধিকারের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ঝিনাইদহের ঘটনা দেখায় যে, রাষ্ট্র সুরক্ষা দিলেও সমাজ অনেক সময় একজন ব্যক্তিকে একঘরে করে দেয়।

কেন এই সামাজিক কাঠিন্য?

  • সামাজিক সংস্কার: গ্রামীণ সমাজে ধর্ম পরিবর্তনকে এখনো ‘কুলত্যাগ’ বা সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়।
  • জ্ঞাতিত্বের রাজনীতি: অনেক সময় সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় রীতিনীতির কারণে পরিবারগুলো ধর্ম ত্যাগী সদস্যকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
  • মানবিক শিক্ষার অভাব: আমরা ধর্মকে আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, ফলে ধর্মের মূল বাণী ‘মানবিকতা’ অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।

“মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, বিশ্বাস আলাদা হতে পারে—কিন্তু মৃত্যু এবং অসুস্থতায় মানবিকতা ও পারিবারিক দায়িত্ব কি সব কিছুর ঊর্ধ্বে হওয়া উচিত নয়? এই প্রশ্নই আজ যাট বাড়িয়া গ্রামের আকাশ-বাতাসে ভাসছে।”

উপসংহার: আমাদের আত্মসমালোচনার সময়

ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখায়, সহনশীলতা শেখায় এবং ক্ষমা করতে শেখায়। ঝিনাইদহের এই ঘটনাটি আমাদের পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করি, তবে তা কোনো ধর্মেরই আদর্শ হতে পারে না।

সবশেষে বলবো, মা-বাবা এবং সন্তানের সম্পর্ক কোনো পার্থিব বিশ্বাসের ফ্রেমে বন্দি থাকা উচিত নয়। মানবিকতা ও দায়িত্ববোধই যেন হয় মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। ঝিনাইদহের এই অজ্ঞাত দাফন হওয়া মানুষটি যেন আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে দিয়ে যায়।


✍️ লেখক: রঞ্জিত বর্মণ

সমাজকর্মী ও কলামিস্ট

Leave a Comment