বরিশাল হিজলায় হিন্দু পরিবারদের জমি দখল: প্রশাসন নিঃশব্দ, জীবন বিপন্ন

বরিশাল হিজলায় হিন্দু পরিবারদের জমি দখল: প্রশাসন নিঃশব্দ, জীবন বিপন্ন

বরিশাল হিজলায় হিন্দু পরিবারদের জমি দখল: প্রশাসন নিঃশব্দ, জীবন বিপন্ন

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন: Ranjit Barmon | বিষয়: মানবাধিকার ও ভূমি বিরোধ

বরিশাল জেলার হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়ি ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামে এক ভয়াবহ মানবিক ও আইনি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের পৈত্রিক ও ব্যক্তিগত জমি দখলের মহোৎসব চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এতে কেবল সাধারণ মানুষের সম্পদই হুমকির মুখে পড়েনি, বরং চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ওই এলাকার একাধিক পরিবার।

স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, স্বপন ঢালী (পিতা: সুশিল ঢালী), মুক্তধ্বজ অমল মাস্টার এবং সুমন বারৈ-এর পৈত্রিক ও বৈধ মালিকানাধীন জমিতে জোরপূর্বক বালু ভরাট করে স্থায়ী স্থাপনা তৈরির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। অভিযোগের তীরের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশালের ছাত্রদল নেতা মহাসীন সিকদার এবং তার নেতৃত্বাধীন একটি সশস্ত্র বাহিনী। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের রেকর্ডীয় জমি দখল করা হচ্ছে, যা সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

ভয়ের আবহে প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানান, তারা তাদের শেষ সম্বল রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও থানা পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। আইনি দলিল ও পরচা থাকা সত্ত্বেও দখলদারদের দাপটে তারা অসহায়। দখলদার বাহিনী প্রকাশ্যে বালু ভরাট করলেও পুলিশ বা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

পরিবারগুলোর দাবি, “আমরা জমিতে যেতে পারছি না, আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনকে জানানো হলেও তারা কেবল আশ্বাসের বাণী দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে দখলদারদের কাজ থেমে নেই।” এই নীরবতাকে স্থানীয় সচেতন মহল ‘দখলদারদের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন’ হিসেবে দেখছেন।

দেশজুড়ে ভূমি জবরদখলের ভয়াবহ চিত্র

কালিকাপুরের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ভূমি আগ্রাসনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশজুড়ে ভূমি অধিকার নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের কিছু ভয়াবহ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

  • দিনাজপুরের জালিয়াতি: সম্প্রতি দিনাজপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ২৩.৩১ একর জমি ভুয়া ও জাল দলিল তৈরি করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও প্রশাসনের ধীরগতির কারণে মূল অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
  • মামলার পরিসংখ্যান: জাতীয় তথ্য ও ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার প্রায় ৬৯ থেকে ৭০ শতাংশই জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর মধ্যে ক্ষুদ্র কৃষক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি আইনি জটিলতার শিকার হন।
  • পটুয়াখালীর প্রতিবাদ: পটুয়াখালীতে প্রায় ২১টি হিন্দু পরিবার তাদের পৈত্রিক জমি ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় ধরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে। প্রশাসনের কাছে বারংবার স্মারকলিপি দিয়েও তারা স্থায়ী কোনো সমাধান পায়নি।
  • রাজনৈতিক প্রভাব: কুড়িগ্রামে সম্প্রতি জমি দখলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যুবদলের দুই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা অনেক ক্ষেত্রে দলীয় পরিচায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সম্পদ গ্রাস করছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও সামাজিক প্রভাব

বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (BPO) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চেয়েও জমি দখলের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট সহিংসতা বর্তমানে বেশি শক্তিশালী। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশের পেছনে কোনো না কোনোভাবে ভূমি বিরোধ বা সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্য থাকে।

ভূমি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের জবরদখল দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দেশত্যাগে বাধ্য হয় বা দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্যের শিকার হয়। এটি কেবল একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং রাষ্ট্রের সামাজিক স্থায়িত্ব ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি এই ক্ষেত্রে বজায় থাকে, তবে সাধারণ মানুষ আইনি ব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে।

কালিকাপুরবাসীর দাবি ও বর্তমান অবস্থা

হিজলার কালিকাপুর গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলো বর্তমানে এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট:

  • অবিলম্বে স্বপন ঢালী, অমল মাস্টার ও সুমন বারৈ-এর জমিতে চলমান অবৈধ বালু ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
  • দখলদার মহাসীন সিকদার ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদার করতে হবে।
  • ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এই জমি বিরোধের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।

এখনো পর্যন্ত বরিশাল জেলা বা হিজলা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীদের একটাই প্রশ্ন— আইন কি কেবল প্রভাবশালীদের জন্য, নাকি সাধারণ মানুষেরও এখানে আশ্রয় পাওয়ার অধিকার আছে?

প্রতিবেদনটি লিখেছেন ও সম্পাদনা করেছেন: Ranjit Barmon

তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

Leave a Comment