বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে তারেক রহমান

🔥 বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ ইতিহাস: তাজউদ্দীন থেকে তারেক রহমান (১৯৭১-২০২৬)

আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের ১২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়। প্রায় ২০ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায়।

১️⃣ স্বাধীনতার সূর্যোদয়: তাজউদ্দীন আহমদ (১৯৭১-১৯৭২)

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি।

কলকাতার ৮ হ্যাঁওয়ার্ড রোডে সরকার পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তিনিই দেশ চালান। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, আমেরিকা সহ বিশ্বের সঙ্গে কূটনীতি করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মোট ৮ মাস ২৬ দিন।

তাজউদ্দীনকে বলা হয় “মুক্তিযুদ্ধের প্রধান পুরুষ”। তাঁর স্তম্ভনাভাবে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সেনা জঙ্গি নির্মমভাবে হত্যা করে।[web:2]

২️⃣ শেখ মুজিবুর রহমান: গণতন্ত্রের ভিত্তি (১৯৭২-১৯৭৫)

১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান প্রণয়ন করেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি জিতে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালু করেন। প্রধানমন্ত্রীর পদটি পরিবর্তিত হয়। পরবর্তীতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুহাম্মদ মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী হন (২৫ জানুয়ারি-১৫ আগস্ট ১৯৭৫)।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সেনা অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সকল সদস্য নিহত হন। এরপর দেশে দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন চলে। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয়।[web:7]

৩️⃣ আশির দশক: সামরিক ছায়ায় প্রধানমন্ত্রী

শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯-১৯৮২)

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকালে প্রথম বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির নেতা। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরও দায়িত্ব চালিয়ে যান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পদত্যাগ করেন।

আতাউর রহমান খান (১৯৮৪-১৯৮৬)

এইচ.এম. এরশাদের শাসনামলে দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় পার্টির নেতা। এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রধানমন্ত্রীর পদটি পুনরায় চালু হয়।

মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬-১৯৮৮)

জাতীয় পার্টির বেসামরিক নেতা। এরশাদের আমলে তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী। সাংবাদিক পটভূমি।

মওদুদ আহমদ (১৯৮৮-১৯৮৯)

জাতীয় পার্টির সিনিয়র নেতা। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দেন। দুইবার প্রধানমন্ত্রী হন।

কাজী জাফর আহমেদ (১৯৮৯-১৯৯০)

জাতীয় পার্টির আরেক নেতা। এরশাদের শেষ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ পতন ঘটে।

৪️⃣ গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম: খালেদা জিয়া যুগ

বেগম খালেদা জিয়া: প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

প্রথম মেয়াদ (১৯৯১-১৯৯৬): ১৯৯১ সালের ২০ অক্টোবর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ শপথ নেন। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় গঙ্গা বাঁধ প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে, বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ করেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বর্জন ঘটে।

দ্বিতীয় মেয়াদ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬): ষষ্ঠ সংসদ গঠন করেন কিন্তু অল্পমেয়াদী হয়।

তৃতীয় মেয়াদ (২০০১-২০০৬): অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট বিজয়ী হয়। ১০ অক্টোবর ২০০১ শপথ নেন। মেঘনা সেতু, কর্ণফুলী টানেলের কাজ শুরু করেন। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। মোট ১০ বছর ১১ মাস দায়িত্ব পালন করেন।

৫️⃣ শেখ হাসিনা: দীর্ঘতম শাসনকালের রেকর্ড

প্রথম মেয়াদ (১৯৯৬-২০০১)

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২৩ জুন ১৯৯৬ শপথ নেন। দেশের প্রথম দুই নারী প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।

দ্বিতীয় মেয়াদ (২০০৯-২০১৪)

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ নবম সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। ৬ জানুয়ারি ২০০৯ শপথ নেন। পদ্মা সেতু নিজ খরচে নির্মাণ শুরু। ঢাকা মেট্রোরেলের কাজ শুরু।

তৃতীয় মেয়াদ (২০১৪-২০১৮)

দশম সংসদ নির্বাচন। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ শপথ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর।

চতুর্থ মেয়াদ (২০১৮-২০২৪)

একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ এবং ১০ জানুয়ারি ২০২৪ শপথ। মোট ১৫ বছর ৭ মাস ২৯ দিন দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ইতিহাসের দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পদত্যাগ করেন এবং ভারতে চলে যান।[web:7]

৬️⃣ তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান

ক্রমিকনামকার্যকালপদবী
বিচারপতি হাবিবুর রহমান১৯৯৬প্রধান উপদেষ্টা
বিচারপতি লতিফুর রহমান২০০১প্রধান উপদেষ্টা
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ২০০৬প্রধান উপদেষ্টা
ড. ফখরুদ্দীন আহমদ২০০৭-২০০৯প্রধান উপদেষ্টা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস৮ আগস্ট ২০২৪-১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬প্রধান উপদেষ্টা

ড. ইউনূস ছাত্র বিপ্লবের পর ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকার চালান। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।[web:11]

🆕 ১২তম প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমান (২০২৬-চলমান)

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডন নির্বাসনের পর দেশে ফিরেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসন, জামায়াত ৬৮ আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ পড়ান। বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্ম নেতৃত্ব শুরু হয়। প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৩৬ বছর পর ক্ষমতায়।[web:11][web:12]

📊 এক নজরে সম্পূর্ণ তালিকা

ক্রনামদলকার্যকালমেয়াদ
তাজউদ্দীন আহমদআওয়ামী লীগ১৭.৪.১৯৭১-১২.১.১৯৭২৮ মাস ২৬ দিন
শেখ মুজিবুর রহমানআওয়ামী লীগ১২.১.১৯৭২-২৫.১.১৯৭৫৩ বছর ১৪ দিন
মুহাম্মদ মনসুর আলীবাকশাল২৫.১.১৯৭৫-১৫.৮.১৯৭৫৭ মাস ২১ দিন
শাহ আজিজুর রহমানবিএনপি১৯৭৯-১৯৮২৩ বছর
আতাউর রহমান খানজাতীয় পার্টি১৯৮৪-১৯৮৬২ বছর
মিজানুর রহমান চৌধুরীজাতীয় পার্টি১৯৮৬-১৯৮৮২ বছর
মওদুদ আহমদজাতীয় পার্টি১৯৮৮-১৯৮৯১ বছর
কাজী জাফর আহমেদজাতীয় পার্টি১৯৮৯-১৯৯০১ বছর
খালেদা জিয়াবিএনপি১৯৯১-৯৬,১৯৯৬,২০০১-০৬১০ বছর ১১ মাস
১০শেখ হাসিনাআওয়ামী লীগ১৯৯৬-২০০১,২০০৯-২০২৪১৫ বছর ৭ মাস
১১মুহাম্মদ ইউনূসনির্দলীয়২০২৪-২০২৬১৮ মাস
১২তারেক রহমানবিএনপি১৭.২.২০২৬-চলমান

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের ৫৫ বছরের ইতিহাসে: যুদ্ধ থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান, সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার—এই নেতারা দেশকে নিয়ে চড়াই-উতরাইয়ের পথ হেঁটেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

লেখক: রঞ্জিত বর্মন | সম্পাদনা: পারপ্লেক্সিটি এআই | প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Leave a Comment