🕉️ সফলা একাদশী: সফলতার ব্রত, আত্মশুদ্ধির সাধনা
ভূমিকা: সফলা একাদশী – সফলতার ব্রত, আত্মশুদ্ধির সাধনা
পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথি “সফলা একাদশী” নামে পরিচিত। “সফলা” শব্দের আক্ষরিক অর্থ সফলতা, সিদ্ধি, বা সার্থকতা—অর্থাৎ যা জীবনকে ফলপ্রদ করে তোলে। এই তিথিতে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর উদ্দেশ্যে উপবাস, ব্রত, পূজা ও ভক্তিভাবে স্মরণ করলে জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর হয়, অশুভ কর্মের প্রভাব ক্ষীণ হয় এবং ভক্ত আত্মিক ও পার্থিব—দুই দিকেই সাফল্যের আশীর্বাদ লাভ করে, এমনই বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন পুরাণে।
স্যানাতন ধর্মে একাদশী তিথিকে সব উপবাসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। অন্যান্য তিথি বা উপবাস যতই শক্তিশালী হোক না কেন, একাদশীর উপবাসের মাহাত্ম্যকে তুলনা করা হয়েছে হাজার বছরের তপস্যার সঙ্গে। বিশেষত সফলা একাদশী এমন একটি ব্রত, যা ভক্তকে বাহ্যিক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের পরিশুদ্ধি, মানসিক শান্তি এবং ঈশ্বরকৃপা লাভের যোগ্য করে তোলে।
শাস্ত্রীয় উল্লেখ: পুরাণে সফলা একাদশীর মাহাত্ম্য
বিভিন্ন পুরাণে একাদশী ব্রতের মহিমা বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে। স্কন্দ পুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ইত্যাদি গ্রন্থে একাদশীকে পাপক্ষয়কারী, পুণ্যবর্ধক ও মোক্ষদায়িনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সফলা একাদশীকে বিশেষভাবে “সফলতা প্রদানকারী একাদশী” বলা হয়। বিশ্বাস করা হয়—
- এই একাদশী পালনে জীবনের অপূর্ণতা দূর হয়,
- পাপকর্মের প্রভাব ক্ষীণ হয়,
- ভক্ত বিষ্ণুলোকে বা পরমধামে গমন করার যোগ্যতা অর্জন করেন।
একটি প্রচলিত শাস্ত্রীয় তুলনায় বলা হয়েছে—যেমন সাপেদের মধ্যে শেষনাগ, পক্ষীদের মধ্যে গরুড়, দেবতাদের মধ্যে বিষ্ণু এবং মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ; তেমনই সব উপবাস বা ব্রতের মধ্যে একাদশী সর্বোত্তম। সে একাদশীগুলোর মধ্যে পৌষ কৃষ্ণপক্ষীয় সফলা একাদশী ত্যাগ, বৈরাগ্য, ভক্তি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে ভক্তজীবনকে সার্থক করে।
লুম্পকের কাহিনি: পাপ থেকে পুনরুত্থানের অনন্য আদর্শ
সফলা একাদশীর বিখ্যাত ব্রতকথা রাজা মহিষ্মতের পুত্র লুম্পককে কেন্দ্র করে। এই কাহিনি আমাদের শেখায় যে, মানুষ যতই পতিত ও পাপাচারী হোক না কেন, ভগবানের কৃপা এবং একাদশীর ব্রত তাকে পুনরায় আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।
লুম্পক শৈশবে রাজকুমার হলেও ধীরে ধীরে পাপাচারে আসক্ত হয়ে পড়ে। সে চুরি, মদ্যপান, নারীসঙ্গ, নিষ্ঠুরতা—সব রকম অন্যায়কর্মে লিপ্ত ছিল। রাজা মহিষ্মত বহুবার তাকে সাবধান করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত পুত্রের অসৎ স্বভাব ও দুষ্কর্মে অতিষ্ঠ হয়ে রাজা তাকে রাজ্যচ্যুত করেন। স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন—সকলের ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লুম্পক একসময়ে এক গভীর বনে আশ্রয় নেয়।
সেখানে গিয়েও সে চুরি ও ডাকাতির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। সে সাধু, ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব—কাউকেই সম্মান করত না। বিষ্ণুনিন্দাও করত বারবার। এই গভীর পাপাচার একসময়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
একদিন পৌষ কৃষ্ণপক্ষের দশমী থেকে একাদশীর সংযোগরাত্রিতে অতিরিক্ত শীত ও কষ্টে জর্জরিত হয়ে সে এক গাছতলায় অচেতনপ্রায় হয়ে পড়ে। খাদ্য জোগাড় করতে না পারায় নিঃশব্দে তার অনিচ্ছাকৃত উপবাস শুরু হয়। একাদশীর দিন সে ক্ষুধা, শীত ও কষ্টে রাত কাটায়; চারপাশের ফল গাছ থেকে কিছু ফল সংগ্রহ করে গাছের নীচে রেখে দেয়, উদ্দেশ্য ছিল পরে খাবে। কিন্তু দুর্বলতার জন্য সে সেদিন প্রায় কিছুই খেতে পারে না।
সেই গাছটি ছিল ভগবান বিষ্ণুর প্রিয় বৃক্ষ, আর সেই স্থানে দেবতার অদৃশ্য উপস্থিতিও ছিল। একাদশীর রাতে ফলগুলি গাছের নীচে রাখা এবং সারারাত জেগে থাকা—শাস্ত্রীয় দৃষ্টিতে যেন এক পূজা ও রাত্রিজাগরণে রূপ নিল। ভগবান বিষ্ণু তার সেই অনিচ্ছাকৃত উপবাস, ফল অর্পণ এবং রাত্রিজাগরণকে সফলা একাদশীর নির্দোষ ব্রত হিসেবে গ্রহণ করলেন।
প্রাতঃকালে আকাশবাণী হল—
“হে লুম্পক, সফলা একাদশীর ব্রতফলে তুমি তোমার রাজ্য ফিরে পাবে, তোমার পাপবুদ্ধি দূর হবে এবং তুমি পুনরায় সৎপথে ফিরে আসবে।”
এই দৈববাণী শুনে তার হৃদয়ে এক গভীর পরিবর্তন আসে। সে পাপের পথ ত্যাগ করে অনুতপ্ত হয়ে ভগবান বিষ্ণুর শরণ নেয়। কিছুদিন পরে সে পুনরায় রাজ্যে ফিরে যায়, পিতা ও প্রজারা তাকে স্নেহের সঙ্গে গ্রহণ করেন। এরপর থেকে সে ন্যায়পরায়ণ রাজা হিসেবে রাজ্য শাসন করতে থাকে এবং জীবনের অন্ত পর্যন্ত বিষ্ণুভক্তি ও একাদশী ব্রতে অটল থাকে।
এই কাহিনির মূল শিক্ষা হল—
- অনিচ্ছাকৃত হলেও একাদশীর উপবাস ও ঈশ্বরস্মরণ ভক্তজীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।
- পাপী মনুষ্যও একাদশী ব্রত ও ভক্তির মাধ্যমে পুনরায় মহৎ জীবনে ফিরতে পারে।
- সফলা একাদশী পাপক্ষয়, পুনরুত্থান ও ঈশ্বরকৃপা লাভের এক মহা সুযোগ।
সফলা একাদশীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
১. আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম
সফলা একাদশীর প্রধান শিক্ষা আত্মশুদ্ধি। উপবাস ও ব্রত মূলত বাহ্যিক খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম নয়, বরং ইন্দ্রিয়নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মনের পরিশুদ্ধি। এই দিনে ভক্ত যখন আহার সংযত করে, তখন মনও ধীরে ধীরে কোলাহল থেকে সঙ্কুচিত হয়ে ঈশ্বরস্মরণে নিবিষ্ট হয়। অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাস কমে গেলে অন্তরে সদাচার, সত্যনিষ্ঠা, নৈতিকতা ও ধার্মিকতার বিকাশ ঘটে।
উপবাস দেহকে যেমন হালকা করে, তেমন মনকেও নানা আসক্তি থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে।
২. পাপক্ষয় ও পূর্বকর্মের প্রভাব লাঘব
শাস্ত্রে একাদশীকে সর্বপাপ বিনাশক তিথি বলা হয়েছে। মানুষের জীবনে সচেতন ও অসচেতন—উভয় প্রকার পাপ জমা হতে থাকে। একাদশীর উপবাস, ঈশ্বরস্মরণ, ব্রতকথা পাঠ বা শ্রবণ—এসবের মাধ্যমে ভক্ত নিজের ভুলগুলো উপলব্ধি করতে শেখে। অনুশোচনা, প্রার্থনা ও ব্রতের পুণ্য মিলিয়ে পূর্বকর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে।
সফলা একাদশী সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে, ভক্তকে পবিত্র পথের দিকে এগিয়ে দেয়।
৩. সফলতা ও সার্থক জীবনের বার্তা
“সফলা” মানে শুধু ধন-সম্পদ বা প্রাপ্যতা নয়; বরং জীবনের প্রকৃত অর্থে সার্থকতা। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকার, ভক্তি—এই গুণগুলোই জীবনকে সত্যিকারভাবে সফল করে। সফলা একাদশী ভক্তকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত সাফল্য হল ঈশ্বরের কৃপা, শান্ত মন, সৎ জীবন ও পুণ্যময় কর্ম।
এই ব্রত মানুষকে শেখায়—সাফল্য মানে শুধু বাইরের অর্জন নয়, ভিতরের পরিশুদ্ধ অনুভূতিও।
কখন পালন করা হয়: তিথি ও সময়
- বাংলা মাস: পৌষ
- পক্ষ: কৃষ্ণপক্ষ
- তিথি: একাদশী
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাধারণত ডিসেম্বর–জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই তিথি পড়ে। তিথি নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পঞ্জিকা বা নির্ভরযোগ্য হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা উচিত। বিভিন্ন অঞ্চলে সূর্যোদয়, চন্দ্রোদয় ও তিথি-মুহূর্তে সামান্য পার্থক্য থাকে; তাই দেশ-কাল অনুযায়ী পঞ্জিকা দেখেই ব্রত গ্রহণ করা উত্তম।
কেন সফলা একাদশী ব্রত পালন করা উচিত
১. আত্মশুদ্ধি ও মানসিক বিকাশ
উপবাস ও ভক্তি মিলিয়ে এই ব্রত মনকে পরিষ্কার করে, হিংসা, ক্রোধ, ঈর্ষা, লোভ থেকে দূরে রাখে। এর ফলে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে, মন শান্ত হয়, চিন্তাভাবনা পবিত্র হয়।
২. দুর্ভাগ্য নাশ ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি
পূর্বকর্মের কিছু নেতিবাচক প্রভাব একাদশীর পুণ্য দ্বারা ক্ষয় হতে থাকে। ভক্তের জীবনে ধীরে ধীরে সুসময় উপস্থিত হয়, সংকটের মধ্যেও পথ খুলে যাওয়ার অনুভূতি জন্মায়।
৩. আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক
নিয়মিত উপবাস ও ব্রত পালনে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি বাড়ে। ভক্ত বুঝতে পারে—সে নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ফলে যে-কোনো অশুভ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার সাহস জন্মায়।
৪. পারিবারিক ও সামাজিক ঐক্য দৃঢ় করা
একাদশীর দিন পরিবার সবাই মিলে পূজা, কীর্তন, গীতা-পাঠ করলে ঘরে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। একসঙ্গে প্রার্থনা করলে মনোমালিন্য কমে, সৌহার্দ্য বাড়ে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ দৃঢ় হয়।
৫. দেহের সুস্থতা ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
একাদশীর উপবাস পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয়, অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের প্রবণতা কমায় এবং শরীরকে হালকা করে। নিয়মিত ও সঠিকভাবে ব্রত পালন করলে এটি শারীরিক দিক থেকেও উপকারী হতে পারে (অবশ্যই অসুস্থ, বয়স্ক বা গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক পরামর্শ জরুরি)।
সফলা একাদশী পালনের পূর্ণাঙ্গ বিধি
১. দশমী তিথি থেকে প্রস্তুতি
সফলা একাদশী পালনের আদর্শ নিয়ম হল দশমী তিথি থেকেই সংযম শুরু করা। দশমীতে নিরামিষ আহার করা উত্তম। অতিভোজন, মদ্যপান, ধূমপান, আহ্লাদী বা অশ্লীল বিনোদন থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। মিথ্যা কথা, অকারণ ঝগড়া, গালিগালাজ—এসব থেকেও বিরত থাকার সংকল্প নিলে ব্রত আরও পবিত্র হয়।
দশমী থেকেই ভক্ত ধীরে ধীরে মনকে ব্রতের দিকে স্থির করে নেন, যাতে একাদশীর দিন আচমকা পরিবর্তন না এসে স্বাভাবিকভাবেই শৃঙ্খলা তৈরি হয়।
২. একাদশীর প্রভাতে করণীয়
- ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করতে হবে।
- ঘরের পূজাস্থান বা মন্দির পরিষ্কার করে গঙ্গাজল বা পবিত্র জল ছিটিয়ে স্থান পবিত্র করা শ্রেয়।
- প্রথমে গণেশ স্মরণ, তারপর ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর নাম করে ব্রতসংকল্প নিতে হবে।
৩. বিষ্ণু-পূজার সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি
- শ্রীবিষ্ণুর বিগ্রহ, ছবি বা শালগ্রাম শিলা থাকলে তাদের আসনে প্রতিষ্ঠা করুন।
- পঞ্চামৃত বা পরিষ্কার জল দিয়ে প্রক্ষালন করুন।
- চন্দন, অক্ষত, হলুদ বা কুমকুম, ধূপ, দীপ, ফুল, তুলসীদল, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি নিবেদন করুন।
- যতটুকু পারেন, শ্রীবিষ্ণুর নাম, স্তব, স্তোত্র, বিষ্ণু সহস্রনাম বা গীতা থেকে কিছু শ্লোক পাঠ করুন।
- বারবার “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” মন্ত্র জপ করলে মন বিষ্ণুময় হয়ে ওঠে।
৪. উপবাসের বিভিন্ন ধরন
- নির্জলা উপবাস: সারা দিন ও রাত জলসহ কোনো খাদ্যগ্রহণ না করা। এটি সর্বোচ্চ কঠিন উপবাস; সুস্থ, সবল এবং অভ্যাসসম্পন্ন ব্যক্তিরাই একে গ্রহণ করবেন।
- ফলাহার উপবাস: দিনে এক বা দুইবার জল, ফল, দুধ বা ফলের রস গ্রহণ করা যায়। শস্যজাতীয় (চাল, গম, ডাল) ও মসলা জাতীয় ভারী খাদ্য বর্জন করা হয়।
- একবার নিরামিষ ভোজন: কেউ কেউ দিনে একবার সিদ্ধ ভাত, শাক-সবজি, লবণ, সামান্য ঘি ইত্যাদি গ্রহণ করে বাকি সময় উপবাস পালন করেন।
মূল কথা হলো—ভোগ নয়, সংযম। দেহকে কষ্ট দিয়ে অসুস্থ করা ব্রতের উদ্দেশ্য নয়; বরং ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করাই হল মূল লক্ষ্য।
৫. রাত্রিজাগরণ ও ভজন-কীর্তন
সফলা একাদশীর অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল জাগরণ। চেষ্টা করুন যেন একাদশীর রাত যতটা সম্ভব জাগ্রত থেকে ঈশ্বরচিন্তায় কাটাতে পারেন। ভজন-কীর্তন, নামসংকীর্তন, গীতা বা পুরাণ পাঠ, সফলা একাদশীর ব্রতকথা শ্রবণ বা পাঠ করতে পারেন। যদি সম্ভব হয়, মন্দিরে কীর্তনে যোগ দিন, নইলে ঘরে ভক্তিমূলক গান শুনেও ঈশ্বরস্মরণে ডুবে থাকতে পারেন।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে—হাজার বছরের তপস্যায় যে ফল পাওয়া দুষ্কর, একাদশীর রাত্রিজাগরণে সেই ফল সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
৬. দ্বাদশী তিথিতে পারণ
ব্রত সমাপ্ত করার নিয়মকেও শাস্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরদিন অর্থাৎ দ্বাদশী তিথিতে সূর্যোদয়ের পর ও নির্দিষ্ট সময় (পঞ্জিকা অনুসারে) দেখে পারণ করতে হবে। পারণের আগে আবার ভগবানকে প্রণাম করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন—তিনি যেন ব্রতটি সফলভাবে পালন করতে শক্তি দিয়েছেন।
দান-ধ্যান: ব্রাহ্মণ, ভক্ত, দরিদ্র বা অভাবীদের অন্ন, বস্ত্র বা অর্থ দান করলে ব্রতের পুণ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায় বলে উল্লেখ রয়েছে।
পালনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
- মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা, কুৎসা, গালাগালি ও ক্রোধ থেকে সর্বোচ্চ বিরত থাকা।
- শস্যজাতীয় খাদ্য—চাল, ডাল, গম ইত্যাদি সম্ভব হলে সম্পূর্ণ বর্জন করা।
- দেহ, বস্ত্র, খাদ্য ও চিন্তায় শুচিতা বজায় রাখা।
- দরিদ্র, অসহায়, ভক্ত ও অতিথিদের সম্মান ও দান করা।
- পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের শান্তি কামনা করা, সম্ভব হলে পিতৃত্রাণ বা তিলতর্পণ করা।
সামাজিক ও মানসিক দৃষ্টিতে সফলা একাদশীর তাৎপর্য
সফলা একাদশী কেবল আধ্যাত্মিক ব্রত নয়; এটি ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজের জন্যও একটি নৈতিক শিক্ষা।
- সংযমের শিক্ষা: নিয়মিত উপবাস মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ভোগ থেকে দূরে রাখে, অপচয় কমায় এবং জীবনে শৃঙ্খলা আনে।
- দানশীলতার বিকাশ: এই তিথিতে দরিদ্র ও অভাবীদের সাহায্য করার নিদান রয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন, সহমর্মিতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি পায়।
- নৈতিকতা ও সততার চর্চা: ব্রতের অংশ হিসেবে মানুষ নিজেকে মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করে। এতে সামগ্রিকভাবে সামাজিক নৈতিকতার মান বাড়ে।
- মানসিক শান্তি ও ইতিবাচকতা: ভগবান স্মরণ ও ভজন-কীর্তন মানসিক চাপ দূর করে, দুশ্চিন্তা কমায় এবং এক বিশেষ প্রশান্তি অনুভূত হয়।
আধুনিক জীবনে সফলা একাদশী পালন: কিছু প্রায়োগিক দিক
- অফিস বা ব্যবসা থাকলে অন্তত একবেলা ফলাহার বা হালকা নিরামিষ খাবার রেখে মন্ত্রজপ করার চেষ্টা করুন।
- মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, বিনোদন—এসব থেকে সচেতনভাবে কয়েক ঘণ্টা দূরে থেকে ভক্তিমূলক পাঠ বা নামজপ করুন।
- পরিবারের সবাইকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় অল্প সময়ের জন্য হলেও কীর্তন বা গীতা-পাঠ করুন।
- দিনটিতে যতটা সম্ভব সৎ, সংযত ও নম্র আচরণ করার সচেতন চেষ্টা করুন।
এভাবে ধীরে ধীরে একদিনের ব্রতের প্রভাব সারাবছরের জীবনচর্চায় ছড়িয়ে পড়বে।
উপসংহার
সফলা একাদশী শুধু একটি তিথির নাম নয়; এটি সফলতার এক আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ। পাপ থেকে পুণ্যের পথে, অন্ধকার থেকে আলোর পথে, হতাশা থেকে আশার দিকে—এই ব্রত ভক্তকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়।
পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে ভক্তিভরে উপবাস, ভগবান বিষ্ণুর পূজা, দান, নামজপ ও রাত্রিজাগরণ করলে জীবনে সৌভাগ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়—শাস্ত্র এমনই আশ্বাস দেয়। একই সঙ্গে এই ব্রত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত সফলতা কেবল অর্থ, পদ বা খ্যাতি নয়; নৈতিকতা, সততা, ভক্তি ও মানসিক শান্তির সমন্বয়েই জীবনের আসল “সফলা” হওয়া।
যাঁরা নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতা নিয়ে সফলা একাদশী ব্রত পালন করেন, তাঁদের জীবন সত্যিই সার্থক ও পুণ্যময় হয়ে ওঠে—এমনটাই ভক্ত হৃদয়ের অকপট অভিজ্ঞতা।
✍️ লেখক: রঞ্জিত বর্মন (বিষয়বস্তুর মূল তথ্যসূত্র প্রদানকারী)
