শ্রীমদ্ভাগবত গীতা: চতুর্থ অধ্যায় (জ্ঞানযোগ) — পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা, তত্ত্ব ও জীবনদর্শন

লেখক: রঞ্জিত বর্মন | বিষয়: সনাতন হিন্দু দর্শন, জ্ঞানযোগ ও কর্মযোগ | অধ্যায়: চতুর্থ অধ্যায় — জ্ঞানযোগ


ভূমিকা: জ্ঞানযোগের প্রয়োজন কেন

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল তত্ত্ব ও জীবনের আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন যখন কর্তব্য ও মমতার টানাপোড়েনে ভেঙে পড়েন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে যে উপদেশ দেন, সেটাই গীতা। এই উপদেশ কেবল অর্জুনের জন্য নয়, সব যুগের সব মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের সমাধান।

চতুর্থ অধ্যায়ের নাম জ্ঞানযোগ বা জ্ঞান‑কর্ম‑সন্ন্যাস যোগ। এখানে কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন—কীভাবে সঠিক জ্ঞান ছাড়া কর্ম মানুষকে বাঁধে, আর জ্ঞানের আলোয় একই কর্ম মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। তাই এই অধ্যায় আসলে কারও কাছে কর্ম থেকে জ্ঞান, আবার কারও কাছে জ্ঞান থেকে কর্ম—এই দুইয়ের সেতুবন্ধন।

এই অধ্যায়ে মোট ৪২টি শ্লোক, যা কয়েকটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়—জ্ঞানের চিরন্তন পরম্পরা, ভগবানের অবতারতত্ত্ব, নিত্য‑কর্ম ও আসক্তিহীনতার শিক্ষা, কর্ম‑অকর্ম‑বিকর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব, যজ্ঞের বিভিন্ন রূপ, জ্ঞানের মহিমা, এবং শেষে সংশয়‑বিনাশের আহ্বান। প্রতিটি অংশই মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।


অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ ও মূল কাঠামো

চতুর্থ অধ্যায়কে সহজে বোঝার জন্য আমরা এটিকে কয়েকটি মূল অংশে দেখতে পারি। বিভিন্ন আচার্য ও গীতা‑ব্যাখ্যায়ও এমন বিভাজন করা হয়।

  • শ্লোক ১–৩: জ্ঞানপরম্পরা—সূর্য, মনু, ইক্ষ্বাকু ও রাজর্ষিদের কাছে যোগশাস্ত্রের প্রেরণ।
  • শ্লোক ৪–৮: ভগবানের অবতারতত্ত্ব—ধর্মের অবক্ষয়ে অবতারের আবির্ভাব।
  • শ্লোক ৯–১৫: ভগবানের জন্ম‑কর্মের ঐশ্বরিকত্ব ও আসক্তিহীন কর্মের শিক্ষা।
  • শ্লোক ১৬–২৪: কর্ম, অকর্ম, বিকর্ম—কর্মে অ‑কর্ম ও অ‑কর্মে কর্ম দেখা; জ্ঞানীর লক্ষণ।
  • শ্লোক ২৫–৩৩: যজ্ঞের বহু রূপ, এবং জ্ঞান‑যজ্ঞের শ্রেষ্ঠতা।
  • শ্লোক ৩৪–৩৯: গুরু‑উপাসনা, জ্ঞানের মহিমা ও অজ্ঞান বিনাশ।
  • শ্লোক ৪০–৪২: সংশয় ছেদন, যোগে প্রতিষ্ঠা ও কর্তব্যপালনের আহ্বান।

এই কাঠামো ধরে ব্যাখ্যা করলে একজন সাধারণ পাঠকও সহজে চতুর্থ অধ্যায়ের গভীর অর্থ বুঝতে পারে এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে।


জ্ঞানের চিরন্তন পরম্পরা (শ্লোক ১–৩)

অধ্যায়ের শুরুতেই কৃষ্ণ ঘোষণা করেন—এই যোগ তিনি প্রথমে সূর্যদেব বিবস্বানকে শিক্ষা দিয়েছিলেন; বিবস্বান তা মনুকে, মনু ইক্ষ্বাকুকে, আর ইক্ষ্বাকু রাজর্ষিদের মধ্যে প্রসারিত করেছিলেন। এইভাবে গীতার জ্ঞান রাজর্ষিদের মধ্যে, অর্থাৎ রাজা‑ঋষিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

কিন্তু “দীর্ঘ কালের প্রভাবে” সেই যোগ এই পৃথিবীতে প্রায় হারিয়ে গেছে, তাই কৃষ্ণ আবার অর্জুনকে তা শিক্ষা দিচ্ছেন। এর দ্বারা বোঝা যায়—সত্য কোনো নতুন সৃষ্টি নয়, বরং বারবার পুনর্জাগরণ হওয়া এক চিরন্তন তত্ত্ব। জ্ঞানপরম্পরা ভেঙে গেলে ধর্ম ও সমাজ উভয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

এই অংশ থেকে দুইটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়—এক, গুরু‑শিষ্য পরম্পরা সনাতন ধর্মের হৃদয়; দুই, ঈশ্বরীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধুই যুক্তি নয়, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিনয়ও প্রয়োজন। রাজর্ষিরা রাজত্ব করেও যোগ‑জ্ঞান ধারণ করতেন, অর্থাৎ গৃহস্থ জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনা একসঙ্গে চলতে পারে।


অবতারতত্ত্ব ও ঈশ্বরের জন্ম‑কর্ম (শ্লোক ৪–৮)

অর্জুন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে—কৃষ্ণ ও সূর্যদেবের যুগভেদ কীভাবে মিলল? তখন কৃষ্ণ তাঁর বহু‑জন্মস্মৃতি ও অজন্মা‑স্বভাবের কথা বলেন—তিনি শাশ্বত, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় মায়াকে আশ্রয় করে অবতীর্ণ হন। এতে বোঝানো হয়, ঈশ্বরের অবতারগ্রহণ মানুষের সাধারণ জন্মের মতো কর্মফলে বাধ্য হয়ে নয়, বরং ইচ্ছা ও করুণা থেকে।

সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি শ্লোকে বলা হয়েছে—যখন ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের বৃদ্ধি ঘটে, তখন ঈশ্বর নিজে অবতীর্ণ হন সাধুদের রক্ষা, দুষ্কৃতির বিনাশ ও ধর্মসংস্থাপনার জন্য। এই তিনটি উদ্দেশ্য শুধু কাহিনি নয়, একটি সার্বজনীন নীতি: ইতিহাসে দেখা যায়, যখনই নৈতিক পতন চরমে পৌঁছায়, তখনই কোনো না কোনো আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ আবির্ভূত হন।

এখান থেকে আমরা বুঝি—অবতারতত্ত্ব কেবল অলৌকিক কাহিনি নয়, বরং ধর্মের পুনর্জাগরণ ও মূল্যবোধের পুনর্স্থাপনের প্রতীক। মানুষের হৃদয়ে যখন সত্য, ন্যায় ও করুণা জেগে ওঠে, তখনই ঈশ্বরত্বের অবতার ঘটে।


ঐশ্বরিক কর্ম ও আসক্তিহীনতা (শ্লোক ৯–১৫)

কৃষ্ণ বলেন—যে তাঁর জন্ম ও কর্মের ঐশ্বরিক স্বরূপ জানে, সে দেহত্যাগের পর আর জন্ম পায় না, বরং ঈশ্বরের ধামে পৌঁছায়। অর্থাৎ মুক্তির এক প্রধান উপায় হচ্ছে ঈশ্বরের প্রকৃতি বোঝা: তিনি কর্মে নিযুক্ত থেকেও কর্মফলে আসক্ত নন, তাই কর্ম তাঁকে বাঁধে না।

এখানে মূল শিক্ষা—কর্ম নিজে কখনো বন্ধনের মূল কারণ নয়; বন্ধন সৃষ্টি করে আসক্তি, অহংকারফল‑লোভ। যে ব্যক্তি ঈশ্বরকে স্মরণ করে, তাঁকে নিবেদন করে, কর্তব্যবোধে কর্ম করে, সে কর্ম করে থেকেও অন্তরে মুক্ত থাকে। এটিই নিষ্কাম কর্মযোগ

কৃষ্ণ বলেন, প্রাচীন কালের মুক্তিপ্রার্থী মহান ব্যক্তিরাও এইভাবে জেনে শুনে কর্ম করতেন। তাই অর্জুনকে তিনি নির্দেশ দেন—তুমি পূর্ববর্তী মহান আত্মাদের মতোই জ্ঞানসহ কর্ম করো; শুধু যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া মুক্তির পথ নয়।


কর্ম, অ‑কর্ম ও বিকর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব (শ্লোক ১৬–২৪)

এই অংশটা খুব সূক্ষ্ম: “কর্ম কী, অ‑কর্ম কী”—এটা বুঝতে পারা কঠিন। শাস্ত্রে তিন ধরনের কর্মের কথা বলা হয়—কর্ম (ধর্মসম্মত কর্তব্য), অকর্ম (নিষ্ক্রিয়তা বা ফলবিচ্ছিন্ন অবস্থান) এবং বিকর্ম (অধর্মমূলক কাজ)।

কৃষ্ণ বলেন, প্রকৃত জ্ঞানী সেইজন, যে কর্মের মধ্যে অ‑কর্ম এবং অ‑কর্মের মধ্যে কর্ম দেখতে পারে। অর্থাৎ বাইরে থেকে সে কাজ করছে মনে হলেও ভেতরে সম্পূর্ণ আসক্তিহীন ও শান্ত; আবার বাইরে স্থির মনে হলেও ভেতরে ঈশ্বরচিন্তার প্রজ্জ্বলিত সাধনা চলতে পারে।

তিনি এমন এক যোগীর চিত্র দেন, যার সব কর্মই যজ্ঞরূপে পরিণত—তার ভোগ নেই, দাবিও নেই; যা করে ব্রহ্মার্পণবুদ্ধিতে করে। এমন কর্মে “অন্তরায়হীন প্রবাহ” থাকলেও তা তাকে বাঁধে না, কারণ সে নিজেকে কর্তা মনে করে না; কর্তা হিসেবে দেখে পরমাত্মাকে।

এই শিক্ষা বর্তমান জীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: অফিস, পরিবার, সমাজ—সব জায়গায় কাজ করেও যদি কেউ মনে মনে বলে “আমি ঈশ্বরের সেবক, এই কাজ তাঁকেই নিবেদন করছি”, তবে কাজের চাপ থেকেও মানসিক মুক্তি আসে।


যজ্ঞের বিভিন্ন রূপ ও জ্ঞান‑যজ্ঞের শ্রেষ্ঠতা (শ্লোক ২৫–৩৩)

এরপর কৃষ্ণ যজ্ঞের ধারণা প্রসারিত করেন। তিনি বলেন, সব মানুষই কোনো না কোনো যজ্ঞ করছে—কেউ দ্রব্য দিয়ে, কেউ তপস্যা দিয়ে, কেউ প্রাণ‑অপান নিয়ন্ত্রণ করে, কেউ ইন্দ্রিয়সংযমের মাধ্যমে, কেউ শাস্ত্র‑অধ্যয়ন দিয়ে। অর্থাৎ, সব নিঃস্বার্থ সাধনা ও আত্মত্যাগই আসলে যজ্ঞ।

অনেকেই ঐতিহ্যগত অগ্নিহোত্র‑যজ্ঞকে একমাত্র যজ্ঞ ভাবেন, কিন্তু গীতা বলে—প্রতিটি নিঃস্বার্থ কাজ, যা ঈশ্বরের উদ্দেশে বা উচ্চতর আদর্শের জন্য করা হয়, তাই যজ্ঞ। বিভন্ন আচার্য এই অংশে ১০–১২ প্রকার যজ্ঞের উল্লেখ করেছেন—দ্রব্য‑যজ্ঞ, তপো‑যজ্ঞ, যোগ‑যজ্ঞ, প্রাণ‑যজ্ঞ, ইন্দ্রিয়‑নিগ্রহ‑যজ্ঞ, স্বাধ্যায়‑যজ্ঞ ইত্যাদি।

এরপর আসে একটি কেন্দ্রীয় শ্লোক: “দ্রব্যময় যজ্ঞের চেয়ে জ্ঞান‑যজ্ঞ শ্রেয়, কারণ সব কর্মই শেষে জ্ঞানে গিয়ে শেষ হয়।” অর্থাৎ, সাদামাটা দান‑ধ্যানও শেষ পর্যন্ত যদি মানুষকে সত্য‑জ্ঞান ও আত্মোপলব্ধির দিকে না নিয়ে যায়, তবে তা অসম্পূর্ণ। তাই সর্বোচ্চ যজ্ঞ হল নিজের অজ্ঞান, অহংকার ও ভুল ধারণাকে জ্ঞানের অগ্নিতে অর্পণ করা।

এখানে বার্তা স্পষ্ট—বাহ্যিক আচার সুন্দর, কিন্তু যথেষ্ট নয়; ভেতরে যদি জ্ঞানের আলো না জ্বলে, তবে আচার কেবল অভ্যাসই রয়ে যায়। যজ্ঞ মানে এমন কাজ, যা মানুষকে ক্রমশ আত্মোপলব্ধির দিকে নিয়ে যায় ও সমাজকে উন্নত করে।


গুরু‑উপাসনা ও জ্ঞানের মহিমা (শ্লোক ৩৪–৩৯)

এই অংশে কৃষ্ণ পরিষ্কার বলেন—“তুমি জ্ঞান অর্জনের জন্য গুরুর কাছে যাও; বিনয়, প্রশ্ন ও সেবার মাধ্যমে তাঁকে সন্তুষ্ট করো; জ্ঞানী গুরু তোমাকে সত্য তত্ত্ব শেখাবেন, যাঁরা বাস্তবে তা উপলব্ধি করেছেন।” এতে বোঝা যায়, শাস্ত্র‑পাঠ একা যথেষ্ট নয়; শাস্ত্রদ্রষ্টা উপলব্ধিমান গুরু অপরিহার্য।

পরের শ্লোকে তিনি বলেন—এই পৃথিবীতে জ্ঞানের মতো পবিত্র কিছু নেই। যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি একসময় নিজেই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই জ্ঞান অর্জন করে। অঙ্গীকার, অধ্যবসায় ও ভক্তি থাকলে জ্ঞান নিজের মনে উদিত হয়।

আরও বলা হয়—বিশ্বাসী, সংযমী, ভক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করে, এবং জ্ঞান পেলে সে দ্রুত পরম শান্তি পায়। বিপরীতে, অবিশ্বাসী, সন্দেহপ্রবণ, অলস মানুষ জ্ঞানলাভে ব্যর্থ হয় এবং সুখও পায় না—না এই জগতে, না পরলোকে। সংশয়ে ভরা মন কোনো পথেই স্থির হতে পারে না—না ভক্তিতে, না জ্ঞানে, না কর্মে।

এই অংশ থেকে শেখা যায়—জ্ঞান মানে কেবল তথ্য নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টি ও উপলব্ধি। এটি অর্জনের জন্য দরকার তিনটি জিনিস: শ্রদ্ধা (śraddhā), সংযম (saṃyama) ও ভক্তি (bhakti)।


সংশয়‑বিনাশ ও যোগে প্রতিষ্ঠা (শ্লোক ৪০–৪২)

অধ্যায়ের শেষ তিন শ্লোকে কৃষ্ণ সংশয়ের বিপদ সম্পর্কে বলেন। যে ব্যক্তি অজ্ঞ, অবিশ্বাসী ও সদা সন্দেহযুক্ত, সে নিজেকে ধ্বংস করে; সে না এই জগতে, না পরলোকে, কোথাও সুখ পায় না। সংশয়ে ভরা মন কোনো পথেই স্থির হতে পারে না—না ভক্তিতে, না জ্ঞানে, না কর্মে।

এরপর তিনি ঘোষণা করেন—যে জ্ঞান দ্বারা কর্ম‑যোগে লিপ্ত হয়ে নিজের সমস্ত কর্মফল যোগের আগুনে দহন করেছে এবং যার সংশয় জ্ঞানের দ্বারা ছিন্ন হয়েছে, তাকে কর্ম আর বাঁধতে পারে না। এইভাবে জ্ঞান, কর্ম ও যোগ একত্রে মুক্তির পথ হয়ে দাঁড়ায়।

অতএব, হৃদয়ে অবস্থিত অজ্ঞান‑সম্ভূত যে সংশয়, তাকে নিজের অন্তরের জ্ঞানের তলোয়ার দিয়ে ছিন্ন করো; যোগে স্থিত হয়ে, হে ভারত, উঠো এবং তোমার কর্তব্য পালন করো।

এটাই চতুর্থ অধ্যায়ের শেষ বার্তা—সংশয় কেটে, যোগে আত্মস্থ হয়ে, নিজের কর্তব্য থেকে পলায়ন না করে, বরং জ্ঞানসহ কর্মে প্রবৃত্ত হও।


জ্ঞানযোগ: আজকের জীবনে কীভাবে প্রয়োগযোগ্য

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র যেমন ছিল এক বিশাল সিদ্ধান্তের মুহূর্ত, আজকের মানুষও তেমনই প্রতিদিন কর্ম‑দ্বিধা, নৈতিক সংকট ও মানসিক চাপের যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে। তাই চতুর্থ অধ্যায়ের শিক্ষা কেবল ৫০০০ বছর আগের জন্য নয়, একেবারে আজকের মানুষের জীবনেও প্রযোজ্য।

  • কর্ম থেকে পালানো নয়, কর্মকে পবিত্র করা: গীতা বলছে—কোনো কাজকে ঘৃণা নয়, বরং নিজের মনকে পরিবর্তন করো; কাজকে ঈশ্বর‑উৎসর্গ করলে তা যজ্ঞ হয়ে যায়।
  • আসক্তি ছেড়ে কর্তব্য পালন: ফল‑লোভ, স্বার্থ ও অহংকার থেকে মুক্ত হলে কাজ হালকা হয়, মানসিক চাপ কমে, এবং একই কাজ আধ্যাত্মিক অনুশীলন হয়ে ওঠে।
  • নির্বাচিত জীবনের মতো নির্বাচিত জ্ঞান: কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, আর সব কর্মের পশ্চাতে যে নীরব আত্মা আছে তাকে জানতে হবে—এটাই জ্ঞানযোগের মূল।
  • গুরু ও শাস্ত্রের প্রতি আস্থা: সম্পূর্ণ নিজে নিজে সব বোঝার মনোভাবের বদলে, প্রাচীন ঋষিদের পথ, গুরু‑শিষ্য পরম্পরা ও শাস্ত্রকে সম্মান করা জরুরি।
  • সন্দেহ কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া: অতিরিক্ত সংশয় মানুষকে ভেঙে দেয়; যুক্তি প্রয়োজন, কিন্তু অনন্ত সন্দেহ নয়। জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম—তিনে মিলেই ভারসাম্য।

চতুর্থ অধ্যায়ের মূল দর্শন এক নজরে

বিষয়কি বলা হয়েছে
জ্ঞানপরম্পরাযোগ‑জ্ঞান সূর্য, মনু, ইক্ষ্বাকু ও রাজর্ষিদের মাধ্যমে যুগে যুগে চলে এসেছে; সত্য কখনও সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না, কেবল আচ্ছন্ন হয়।
অবতারতত্ত্বধর্মের অবক্ষয় ও অধর্মের উত্থানে ঈশ্বর নিজেই অবতীর্ণ হন—সাধু রক্ষা, দুষ্কৃত বিনাশ ও ধর্মসংস্থাপনার জন্য।
ঐশ্বরিক কর্মভগবানের কর্ম আসক্তিহীন, তাই তাঁকে কর্ম বাঁধে না; এই সত্য বুঝে মানুষও আসক্তিহীন কর্মের মাধ্যমে মুক্ত হতে পারে।
কর্ম‑অকর্ম‑বিকর্মকর্মের মধ্যে অ‑কর্ম, অ‑কর্মের মধ্যে কর্ম—এই সূক্ষ্ম দর্শন বোঝা জ্ঞানীর লক্ষণ; উদ্দেশ্য ও চেতনা কর্মের প্রকৃতি নির্ধারণ করে।
যজ্ঞতত্ত্বদ্রব্য, তপস্যা, যোগ, প্রাণ‑নিয়ন্ত্রণ, ইন্দ্রিয়সংযম ও শাস্ত্র‑অধ্যয়নসহ সব নিঃস্বার্থ সাধনাই যজ্ঞ; কিন্তু জ্ঞান‑যজ্ঞ সর্বশ্রেষ্ঠ।
গুরু‑উপাসনাবিনয়, প্রশ্ন ও সেবা—এই তিনের মাধ্যমে গুরুর কাছ থেকে তত্ত্বজ্ঞান গ্রহণ করতে হয়; অভিজ্ঞ গুরুই সত্যকে উন্মোচন করেন।
জ্ঞানের মহিমাজ্ঞানই সর্বোত্তম পবিত্রতা; শুদ্ধ জ্ঞান অজ্ঞান ও পাপকে দগ্ধ করে, জীবনে পরম শান্তি আনে।
সংশয়‑বিনাশসন্দেহপ্রবণ ব্যক্তি না ইহলোক, না পরলোক—কোথাও পূর্ণ সুখ পায় না; জ্ঞানের তরবারি দিয়ে হৃদয়ের সংশয় কেটে যোগে প্রতিষ্ঠা পেতে বলা হয়েছে।

উপসংহার: জ্ঞানসহ কর্মই মুক্তির মহাসড়ক

চতুর্থ অধ্যায় আমাদের যে সার শিক্ষা দেয় তা হলো—কর্ম থেকে পালিয়ে নয়, জ্ঞানসহ কর্ম করেই মুক্তি সম্ভব। ঈশ্বর নিজেও কর্মে নিযুক্ত—সৃষ্টি, পালন, সংহার—তবু তিনি আসক্ত নন; তাই তিনি মুক্ত। মানুষও যদি কৃষ্ণের মতো কর্মকে যজ্ঞ বানিয়ে, ফলকে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করে, তবে তার প্রতিটি কাজই যোগ হয়ে ওঠে।

এই অধ্যায় গীতার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে দেখায়—কর্মযোগজ্ঞানযোগ একে অপরের বিপরীত নয়; বরং সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে সঠিক কর্মে প্রবৃত্ত করে, আর সঠিক কর্ম মানুষকে জ্ঞানলাভের উপযুক্ত করে তোলে। এইভাবেই কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি একত্রিত হয়ে সমগ্র সনাতন ধর্মের ভিত্তি তৈরি করে।

একজন আধুনিক পাঠকের জন্য এই অধ্যায়ের বার্তা খুব পরিষ্কার: নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে নয়, সেটিকে ঈশ্বর‑স্মরণ, সততা, নিঃস্বার্থতা ও জ্ঞানের আলো দিয়ে পূত করো। জীবনের প্রতিটি কাজই তখন নিত্য‑যজ্ঞ, আর পুরো জীবনই হয়ে ওঠে জ্ঞানযোগের এক অবিচ্ছিন্ন সাধনা।

ওম তৎ সৎ

Leave a Comment