বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা ২০২৬: কোথায় কীভাবে উদযাপন হচ্ছে
সরস্বতী পূজা হিন্দু ধর্মের এক শান্ত, নীরব অথচ গভীরতর অর্থবহ উৎসব। বিদ্যা, বুদ্ধি, সুর, শিল্প ও জ্ঞানের দেবী মা সরস্বতীর আরাধনায় যে দিনটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকরা, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা একত্রিত হন, সেই দিনটি শুধু ধর্মীয় আচারের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষা, মনন ও মানবিকতার বিস্তৃত পরিসরে। 📚
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরস্বতী পূজা আরও এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে এই পূজা একদিকে যেমন হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চর্চার অংশ, অন্যদিকে তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক পরিমণ্ডলের মিলিত উৎসব হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ—সব বিভাগেই সরস্বতী পূজার সুর এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে।
বসন্ত পঞ্চমী ও ২০২৬ সালে সরস্বতী পূজার তারিখ
পৌষ-মাঘের শীত যখন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে, গাছে গাছে নতুন পাতার আভাস, মাঠে সরিষার হলুদ আর আকাশে হালকা রোদের মিষ্টি উজ্জ্বলতা নিয়ে যে ঋতু ধীরে ধীরে ফিরে আসে, তাকে বলা হয় বসন্ত। এই বসন্তের সূচনালগ্নে যে পঞ্চমী তিথি, সেটিই বসন্ত পঞ্চমী, আর এই তিথিতেই দেশজুড়ে পালিত হয় সরস্বতী পূজা।
২০২৬ সালে বসন্ত পঞ্চমী তথা সরস্বতী পূজা পালিত হচ্ছে শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি। বিভিন্ন পঞ্জিকা ও তিথি নির্ণায়ক সূত্র অনুযায়ী এদিন ভোরে পঞ্চমী তিথি শুরু হয়ে পরদিন রাত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে, ফলে সকালে ভোর থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত পূজার জন্য শুভ মুহূর্ত ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্ডিত, মন্দির ও আশ্রমগুলো এই সময়কে কেন্দ্র করেই আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
মা সরস্বতীর ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক গুরুত্ব 🎶
শাস্ত্র মতে মা সরস্বতী হলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি অজ্ঞানকে দূর করে মানুষের অন্তরকে আলোকিত করেন—এই বিশ্বাস থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী ও গবেষকরা তাঁর চরণে প্রণাম নিবেদন করেন। শ্বেতবসনা, পদ্মাসনা, হাতে বীণা ও পুস্তকধারিণী এই দেবীর মূর্তি যেন জ্ঞান ও সুরের এক প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।
সরস্বতী পূজার দিনে বই, খাতা, কলম, বাদ্যযন্ত্র, চিত্রাঙ্কনের উপকরণ, ল্যাপটপ কিংবা পড়াশোনার নোট পর্যন্ত দেবীর সামনে সাজিয়ে রাখা হয়। অনেক পরিবারের শিশুর প্রথম অক্ষর শেখানো বা হাতেখড়ি এদিনেই সম্পন্ন হয়। 🎓 এই হাতেখড়ির অনুষঙ্গ শুধু আচার নয়, বরং এক ধরনের মানসিক অঙ্গীকার—জীবনের পথে আলো ও জ্ঞানের অনুসরণ করার প্রত্যয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য
বাংলাদেশে সরস্বতী পূজার সবচেয়ে বড়, সুসংগঠিত ও ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। প্রতিবছরের মতো ২০২৬ সালেও এখানে সরস্বতী পূজা হচ্ছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলসমূহ নিজস্ব উদ্যোগে পূজামণ্ডপ নির্মাণ করছে।
জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে সাধারণত বহু প্যাভিলিয়ন বা পূজামণ্ডপ নির্মাণ করা হয়, যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনের উদ্যোগে সাজানো হয়। প্রতিটি মণ্ডপে থাকে একেক রকম নকশা, সৃজনশীল চিন্তা ও সামাজিক বার্তা—কোথাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কোথাও নারীশিক্ষার গুরুত্ব, আবার কোথাও ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার আহ্বান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালক ও ছাত্রী হলগুলোর অভ্যন্তরেও অনুষ্ঠিত হয় পৃথক সরস্বতী পূজা। রোকেয়া হল, কবি সুফিয়া কামাল হল, শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলসহ বিভিন্ন ছাত্রী হলেও ছাত্রীদের উদ্যোগেই পূজার আয়োজন দেখা যায়, যেখানে তাদের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সাজসজ্জা এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
জগন্নাথ হলের মাঠজুড়ে সারি সারি মণ্ডপ, সন্ধ্যায় প্রদীপের আলো আর ভীড়ের ভেতরেও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় পরিবেশ—সরস্বতী পূজার এই ছবি যেন বাংলাদেশে জ্ঞান ও সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। 📷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সংস্কৃতি ও প্রতিমা নির্মাণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ সরস্বতী পূজার সময় একটি নান্দনিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। প্রতিবছরের মতো ২০২৬ সালেও চারুকলার শিক্ষার্থীরা কর্কশিট, বাঁশ, কাঠ ও বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি করছেন বড় সরস্বতী প্রতিমা, যা জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝ বরাবর স্থাপন করা হয়।
এই প্রতিমা ও তার চারপাশের সাজসজ্জা শুধু পূজার অংশ নয়, বরং একধরনের মুক্তমঞ্চ শিল্প-প্রদর্শনী। অনেকে সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন ঠিক এই দৃশ্যটি দেখার জন্য—রাতের আলোয় পুকুরের মাঝখানে সাদা সরস্বতীর প্রতিচ্ছবি, চারদিকে প্রদীপ আর ফুলের নরম আলো। 🎨
রাজধানী ঢাকার অন্যান্য পূজামণ্ডপ 🏙️
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও রাজধানীজুড়ে অসংখ্য মন্দির, আশ্রম, পাড়া-মহল্লা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুর, ফরাশগঞ্জ কিংবা ধানমন্ডি, মিরপুর, বনানী, উত্তরা—বিভিন্ন এলাকায় মন্দির ও কমিউনিটি সেন্টারভিত্তিক পূজার আয়োজন থাকে, যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভক্ত, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, রমনা কালীমন্দির, তেজগাঁও এলাকার মন্দির ও আশ্রমগুলোতেও সরস্বতী পূজা উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন থাকে। প্রভাতি আরতি, পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক সঙ্গীত ও আলোচনা সভা—সবকিছু মিলিয়ে দিনভর জমে ওঠে এক শান্ত, স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা 🎓
বাংলাদেশে সরস্বতী পূজার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এটি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাংগঠনিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই তহবিল গড়ে পূজার আয়োজন করে।
এ ধরনের অনুষ্ঠানে সাধারণত থাকে সকালের পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি, দুপুরে প্রসাদ বিতরণ, বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রাতে মিলনমেলা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশ নেয়—অনেকে সরাসরি পূজায় অংশ না নিলেও বন্ধুদের সঙ্গে এসে মণ্ডপ দেখে, ছবি তোলে, অনুষ্ঠানে বসে গান শোনে। এই অংশগ্রহণই সরস্বতী পূজাকে শুধুই ধর্মীয় দিবস থেকে একটি সামষ্টিক শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ দেয়।
চট্টগ্রাম ও বন্দরনগরীর উদযাপন
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও সরস্বতী পূজা একটি বড় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। শহরের জামালখান, আন্দরকিল্লা, আগ্রাবাদ, ষোলশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মন্দির, আশ্রম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে পূজার আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রাম কলেজ, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপ তৈরি হয়, যা সারাদিন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকে।
বন্দর এলাকা ও পাহাড়ি জনপদ ঘেঁষা চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলেও পাড়া-ভিত্তিক সরস্বতী পূজার প্রচলন আছে। সেখানে মাটির প্রতিমা, বাঁশের মঞ্চ, টিন বা কাপড়ের ছাউনি, স্থানীয় শিল্পীদের গান ও যাত্রাপালা—সব মিলিয়ে সরস্বতী পূজা হয়ে ওঠে গ্রামীণ সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। 🎪
রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে পূজা
রাজশাহী বিভাগের শহর ও গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, জয়পুরহাট অঞ্চলে বহু পুরোনো মন্দির ও বিদ্যালয়ভিত্তিক সরস্বতী পূজার ঐতিহ্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে মণ্ডপ সাজিয়ে পূজা করে, আর সন্ধ্যায় আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী।
খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে নদীঘেরা জনপদে, মন্দিরের আঙিনায় কিংবা আশ্রমে সরস্বতী পূজা বেশ শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়। সাতক্ষীরা, যশোর, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের প্রতিবেশীরাও মণ্ডপে এসে শুভেচ্ছা জানায়, অনেকে পরিবারসহ এসে পূজার সাজসজ্জা উপভোগ করে।
সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহর-গ্রামজুড়ে সরস্বতী পূজা পালিত হয়। বিশেষ করে সিলেটের চা-শ্রমিক এলাকায় ও রংপুর অঞ্চলের গ্রামীণ হিন্দুসমাজে পূজাকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যায় নাটক, পালাগান বা কীর্তনও হয়, যা স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে বহু বছর ধরে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় শান্তিপূর্ণ উদযাপন 🕊️
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এলাকায় বসবাসকারী হিন্দু ও অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মাঝেও সরস্বতী পূজার আয়োজন দেখা যায়। মন্দির বা সমবায়ভিত্তিক আশ্রমে পূজা হয়, আর আশেপাশের পাহাড়ি গ্রাম থেকেও অনেক মানুষ এসে এ উৎসবে অংশ নেয়।
গোপালগঞ্জ, খুলনা, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, যশোরসহ যেসব অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায় তুলনামূলক ঘনবসতিপূর্ণ, সেখানে সরস্বতী পূজা এক ধরনের সামাজিক মিলনমেলা। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য ধর্মের মানুষও শুভেচ্ছা জানাতে মণ্ডপে আসেন, যা বাস্তব জীবনে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের সুস্পষ্ট উদাহরণ।
পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ ও উপাচার
সরস্বতী পূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। শুভ সময়ে পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করেন, আর ভক্তেরা হাতে ফুল নিয়ে একযোগে প্রার্থনা করেন—জ্ঞান, মনোনিবেশ ও সৎ জীবনের জন্য আশীর্বাদ কামনা করে। মন্দির বা মণ্ডপভেদে ছোট বড় সব আয়োজনেই এই মুহূর্তটি ভক্তদের কাছে সবচেয়ে আবেগঘন।
পূজা শেষে ভক্তদের হাতে প্রসাদ হিসেবে মিষ্টি, ফল, বাতাসা, খিচুড়ি বা পায়েশ বিতরণ করা হয়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, ছবি তোলা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে রঙিন স্মৃতিময়। 😊
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সৃজনশীলতার উন্মেষ 🎤
সরস্বতী পূজার আরেকটি বড় দিক হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংঘ, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকগান, আবৃত্তি, একক ও দলীয় নৃত্য এবং নাটক। এ ধরনের অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করে।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই দিনটিকে ঘিরে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা বা বইমেলারও আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পায়, আবার একই সঙ্গে অন্যদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়—যা শিক্ষা ও সৃজনশীলতার পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক শিক্ষা 💛
বাংলাদেশে সরস্বতী পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থান। মণ্ডপে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে দেখা যায়—ভিন্ন ধর্মের বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী বা সহকর্মীরাও উৎসবের অংশ হয়ে উঠছেন। কেউ সরাসরি প্রার্থনায় অংশ না নিলেও, পূজার সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সবার উপস্থিতি এক ধরনের মিলিত মানবিকতার বার্তা দেয়।
বর্তমান সময়ে যখন বিভাজন, বিদ্বেষ ও অশান্তি বিশ্বের নানা প্রান্তে মানবিক সম্পর্ককে দুর্বল করছে, তখন সরস্বতী পূজার মতো উৎসব শিক্ষা দেয়—জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্য কোনো একক ধর্মের সম্পদ নয়; এগুলো মানবসভ্যতার সামষ্টিক অর্জন। ✨
ডিজিটাল যুগে সরস্বতী পূজা ও তরুণ প্রজন্ম
ডিজিটাল যুগে সরস্বতী পূজার আনন্দ এখন শুধু মন্দির বা ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। শিক্ষার্থীরা পূজার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে মণ্ডপের সাজসজ্জা, প্রতিমা, পুষ্পাঞ্জলি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছবি এবং ভিডিও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবে শেয়ার করছে।
এতে একদিকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিসহ যারা সরাসরি পূজায় যেতে পারছেন না, তারাও এই উৎসবের সঙ্গী হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি নিজস্ব পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক সৃজনশীল সুযোগ। 🌏
নারীশিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও সরস্বতী পূজার বার্তা
মা সরস্বতীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উৎসব নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীশিক্ষার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়। প্রতিমায় যে নারীমূর্তি—সাদা শাড়ি, হাতে বই ও বীণা, শান্ত অথচ দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন—এ যেন জ্ঞান-বিজ্ঞানে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের প্রতীকী ঘোষণা।
বাংলাদেশের নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, সরস্বতী পূজার পরিকল্পনা, অর্থসংগ্রহ, সাজসজ্জা ও পরিচালনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এতে তাদের নেতৃত্বগুণ, সংগঠক হিসেবে দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস—সবই ক্রমে বিকশিত হয়, যা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সরস্বতী পূজার গুরুত্বপূর্ণ দিক
২০২৬ সালে সরস্বতী পূজার অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা, পরিবেশ বান্ধব উপকরণ ব্যবহার, সাউন্ড সিস্টেমের সঠিক নিয়ন্ত্রণ, এবং সবার জন্য উন্মুক্ত কিন্তু শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও আয়োজকরা একযোগে কাজ করছেন, যেন উৎসবের আনন্দের সঙ্গে নিরাপত্তা ও স্বস্তি দুটোই বজায় থাকে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচল, এবং রাতে আলো-সজ্জার ব্যবস্থার পাশাপাশি অনেক মণ্ডপে পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও তুলে ধরা হচ্ছে—মাটির প্রতিমা, কম প্লাস্টিক ব্যবহার, শব্দদূষণ কমানো ইত্যাদি উদ্যোগ উৎসবকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলছে। 🌱
উপসংহার: জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাক 🌼
বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা ২০২৬ আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—জ্ঞান, শিল্প, সঙ্গীত ও সৃজনশীলতা মানুষের জীবনকে কতটা সুন্দর, মানবিক ও আলোকিত করে তুলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল থেকে শুরু করে ঢাকেশ্বরী মন্দির, পুরান ঢাকার অলিগলি, চট্টগ্রামের পাহাড়, উত্তরবঙ্গের গ্রাম, দক্ষিণের নদীপাড়—সবখানেই এই পূজা একসূত্রে গেঁথে রাখে বাংলার হিন্দু সমাজকে, আর পাশাপাশি কাছাকাছি টেনে আনে অন্যান্য ধর্মের মানুষকেও।
মা সরস্বতীর আশীর্বাদে যেন প্রতিটি শিশুর হাতে উঠে আসে বই, প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জীবনে ফিরে আসে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ, এবং পুরো সমাজে জেগে ওঠে মননশীলতার আলো। অন্ধকার ভুলে মানুষ যেন আলোর পথ বেছে নেয়, বিদ্বেষ ও বিভাজনের বদলে যেন গড়ে ওঠে সম্মান, সহানুভূতি ও শিক্ষার সংস্কৃতি—এই হোক সরস্বতী পূজা ২০২৬-এর মূল প্রার্থনা। ✨
