বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে ভারতের কড়া বার্তা, প্রকাশ্যে গভীর উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ● প্রতিবেদন: রঞ্জিত বর্মন
বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কঠোর ও কড়া ভাষার প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of External Affairs—MEA) স্পষ্ট জানিয়েছে, এসব হামলা এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি “উদ্বেগজনক ধারাবাহিক প্রবণতা”, যা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে MEA–এর মুখপাত্র রন্ধির জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্ত আক্রমণ, তাদের বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং চরমপন্থীদের উসকানিমূলক তৎপরতা ভারতের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনার কঠোর ও দ্রুত মোকাবিলা না করলে তা শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।
ধারাবাহিক হামলা ও ‘উদ্বেগজনক প্যাটার্ন’ নিয়ে ভারতের ভাষ্য
ভারতের অভিযোগ, সাম্প্রতিক দুই বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে পরিমাণ হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তা আর “একক বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ” বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মানবাধিকার সংগঠন ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধি সংগঠনগুলোর দাবি, বিভিন্ন সময়ে তারা সরকার ও প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ, স্মারকলিপি ও রিপোর্ট দিয়েও যে পর্যাপ্ত সাড়া পাচ্ছেন না, তা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
MEA মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, “আমরা বারবার দেখছি, বাংলাদেশে চরমপন্থী গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্ত আক্রমণ এবং তাদের বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার একটি উদ্বেগজনক ধারা তৈরি হয়েছে।” দিল্লির মতে, এ ধরনের ঘটনা যদি যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে এটি শুধু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক আইন–শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দিপু হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক নৃশংস ঘটনার উল্লেখ
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়ার পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনা বড় ভূমিকা রেখেছে। ময়মনসিংহের এক তরুণ হিন্দু গার্মেন্টস কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে নবীজিকে অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যা এবং পরবর্তীতে মরদেহকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া—এই ভয়াবহ ঘটনা দেশ–বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি তোলে।
একই সময়ে দেশের অন্যান্য এলাকায়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্যের ওপর হামলা ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, কোথাও মন্দিরে হামলা, আবার কোথাও সামাজিক অপমান ও গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে সংখ্যালঘু নাগরিকদের। এসব ঘটনা ভারতের চোখে “একটি বড় চিত্রের অংশ”, যেখানে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে সংখ্যালঘুরা ক্রমাগত ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।
‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ বা ‘রাজনৈতিক বিরোধ’ বলে এড়ানোর অভিযোগ
ভারতের আরেকটি গুরুতর অভিযোগ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে অনেক সময় পদ্ধতিগতভাবে “ব্যক্তিগত শত্রুতা” বা “রাজনৈতিক বিরোধ” বলে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে হালকা করে দেখানো যায়। তাদের ভাষায়, যেসব ঘটনায় স্পষ্টভাবে সাম্প্রদায়িক স্লোগান, ধর্মীয় উসকানি বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের লোকদের টার্গেট করে হামলার অভিযোগ আছে, সেগুলোকে শুধুই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের খাতায় ফেলা বাস্তবতাকে বিকৃত করে।
MEA মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা লক্ষ্য করছি, এসব নৃশংস হামলার অনেককেই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এই ধরনের অবমূল্যায়ন এবং অজুহাত কেবল অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।” ভারতের মতে, যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজন আক্রান্ত হন, তাদের বাড়ি–দোকান ভাঙা হয়, তখন সেটা ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোভাবের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ সরকারের পাল্টা অবস্থান ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ও সরকারি মহলের পক্ষ থেকে ভারতের এই মন্তব্যের প্রতি দৃশ্যত অসন্তোষ দেখা গেছে। ঢাকার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, ভারতের প্রকাশিত বিবৃতিগুলো “অতিরঞ্জিত, পক্ষপাতদুষ্ট এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তাদের দাবি, কিছু অপরাধমূলক ঘটনা ও স্থানীয় দ্বন্দ্বকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে “সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, অনেক ঘটনায় যাদের ওপর হামলার কথা বলা হচ্ছে, তাদের কেউ কেউ নাকি তালিকাভুক্ত অপরাধী বা চাঁদাবাজ; সেই প্রেক্ষাপটে সংঘটিত কিছু অপরাধকে পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এ ধরনের যুক্তি দিয়ে ঢাকা বলতে চেয়েছে, দেশের আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে অতিরঞ্জিত আন্তর্জাতিক প্রচার দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের প্রশ্ন
ভারতের বার্তায় মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তাদের ভাষ্যে, সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টেকনিক্যাল দায়িত্ব নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের প্রতি প্রতিশ্রুতির অংশ। যদি কোনো দেশ সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও বৈধতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
এ প্রসঙ্গে ভারতীয় কূটনীতি মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও মানবাধিকার কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী, যেখানে ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য ও সহিংসতা রোধের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং তার যথাযথ তদন্ত–বিচার না হওয়া কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতিবাচক বার্তা পাঠায় এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে—কখনো সামরিক শাসনের সময়, কখনো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে, কখনো আবার নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার ঢেউয়ে। এসব ঘটনার প্রত্যেকটির পিছনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ থাকলেও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই—ভয়, অনিশ্চয়তা এবং বিচার না পাওয়ার বেদনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখনই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে বা ক্ষমতার পালাবদলের সময় এসেছে, তখনই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছে; আবার কোথাও জমি–জমা ও সম্পত্তি দখলের লক্ষ্যেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে আজকের সংকটকে বুঝতে হলে এই দীর্ঘ ইতিহাসকেও মনে রাখতে হয়।
স্থানীয় সংখ্যালঘুদের অভিজ্ঞতা ও মাঠের বাস্তবতা
মাঠের বাস্তবে দেখা যায়, গ্রাম বা মফস্বলের অনেক সংখ্যালঘু পরিবার হামলার ঘটনার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও নানা অজুহাতে অভিযোগ গ্রহণ করা হয় না, কিংবা মামলা নিতে গড়িমসি করা হয়। এতে ভুক্তভোগীরা বারবার মনে করেন, আইনের আশ্রয় নিতে গেলেও তারা পূর্ণ সুরক্ষা বা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না; বরং হামলাকারী গোষ্ঠী আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর রাতের অন্ধকারে নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে হামলা, লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, অথচ পরদিন রাজনৈতিক তদবিরে ঘটনাটি “ভুল বোঝাবুঝি” বা “ছোটখাটো ঝামেলা” বলে কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এর ফলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাস ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে তাদের দেশত্যাগ বা নিঃশব্দ আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের দাবি
বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও প্রগতিশীল মহলের দাবি—সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে “ফাস্ট ট্র্যাক” ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, যাতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে না থাকে। পাশাপাশি প্রতিটি সহিংস ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
অনেক সংগঠন প্রস্তাব করছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ “কমিউনাল হারমনি টাস্কফোর্স” গঠন করে সেখানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সংখ্যালঘু প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজকে যুক্ত করা যেতে পারে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, গুজব–প্রবণ ইস্যু সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা তৈরি করা এবং ধর্মীয় উৎসবের সময় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া—এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের দাবি তুলছেন তারা।
ভারতীয় রাজনীতিতে ইস্যুটির গুরুত্ব
ভারতেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির অংশ। সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী সময়ে প্রায়ই বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে প্রচার চালায়। কেউ কেউ বলেন, প্রতিবেশী দেশে হিন্দুদের নিরাপত্তাহীনতা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অভিবাসন–সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন ও প্রবাসী বাংলাদেশি হিন্দু কমিউনিটিও প্রায়ই দিল্লি ও রাজ্য রাজধানীগুলোতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালন করে থাকে। এসব কর্মসূচিতে তাদের মূল দাবি থাকে—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জীবনের নিশ্চয়তা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, জমি–জমা দখল বন্ধ এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোও অনেক সময় এ দাবিগুলো নিজের অবস্থানের পক্ষে ব্যবহার করে থাকে।
মিডিয়ার ভূমিকা ও ভুয়া প্রচারের ঝুঁকি
বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার ভূমিকাও এখন আলোচনায়। ভারতের অভিযোগের মধ্যে আছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার খবর তুলে ধরতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যম চাপের মুখে থাকে, ফলে সব তথ্য সবসময় সামনে আসে না। আবার বাংলাদেশের বক্তব্য, কিছু আন্তর্জাতিক ও প্রতিবেশী দেশের কিছু প্ল্যাটফর্ম “চেরি পিকিং” করে কেবল কিছু খবরকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করে, যাতে সামগ্রিক বাস্তবতা বিকৃত হয়।
বাস্তবতা হলো, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কোনো ঘটনার ভিডিও বা ছবি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, কিন্তু সব ভিজ্যুয়ালই যে সঠিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়, তা নয়। গুজব, ভুয়া খবর এবং উসকানিমূলক পোস্ট খুব দ্রুত মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে—ফলে মাঠের পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়িত্বশীল মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং নিরপেক্ষ ফ্যাক্ট–চেকিং প্ল্যাটফর্মকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে সত্য ও মিথ্যা আলাদা করা সহজ হয়।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভারতের সতর্ক বার্তা
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও জলবণ্টনসহ নানা সংবেদনশীল ইস্যুতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার দিকে এগিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এবং এ নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান এই সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভ এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ ইস্যুতে দুপক্ষ প্রকাশ্য বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সীমান্ত–অঞ্চলে নিরাপত্তা সমস্যা, অনুপ্রবেশ, শরণার্থী সঙ্কট বা চোরাচালানের মতো পুরোনো সমস্যাগুলোকেও নতুনভাবে উসকে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন, পর্দার আড়ালে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে তথ্য, প্রমাণ ও উদ্বেগগুলো একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করা এবং যৌথভাবে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ মোকাবিলার রূপরেখা তৈরি করা।
করণীয়: বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য কিছু সুপারিশ
পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ককে সংঘাতের পথে না নিয়ে গিয়ে সহযোগিতার পথে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। এ জন্য কিছু বাস্তবসম্মত করণীয় তুলে ধরা হচ্ছে, যেগুলো দুই দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল মিলেই বাস্তবায়ন করতে পারে।
- বাংলাদেশের ভেতরে সব সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা।
- সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও কমিউনিটি পুলিশিং চালু করা, যাতে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আগেই তা চিহ্নিত করা যায়।
- দুই দেশের মধ্যে মানবাধিকার সংলাপ, ট্র্যাক–টু আলোচনাসহ নিয়মিত ডেটা ও অভিজ্ঞতা শেয়ারিং প্রক্রিয়া চালু রাখা।
- উসকানিমূলক প্রচার রোধে উভয় দেশের মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান এবং ভুয়া খবর ঠেকাতে যৌথ ফ্যাক্ট–চেক উদ্যোগ নেওয়া।
- ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু পরিবারের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং মানসিক সহায়তার জন্য বিশেষ তহবিল ও নীতিমালা প্রণয়ন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উদ্বেগ আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে বিপরীত মেরুতে দাঁড় করালে সমাধানের পথ সংকীর্ণ হয়; বরং যৌথভাবে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে কাজ করলে আঞ্চলিক শান্তি, বাণিজ্য ও উন্নয়নের জন্যও তা লাভজনক হবে। সংখ্যালঘুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা গেলে কেবল তখনই দক্ষিণ এশিয়ার বহুমাত্রিক সহাবস্থানের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে।
লেখক: রঞ্জিত বর্মন
