দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশে সূর্য উপাসনার ইতিহাস বলতে গেলে এক অনিবার্য নাম মুলতান সূর্য মন্দির। পাকিস্তানের বর্তমান পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান শহরে অবস্থিত এই প্রাচীন হিন্দু সূর্য মন্দিরকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি, আক্রমণের রক্তাক্ত স্মৃতি এবং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস।
আজ এই মন্দিরের স্থাপত্য নেই, নেই সোনার প্রতিমা, নেই তীর্থযাত্রীর ভিড়; তবুও ইতিহাসের পাতায় ও লোককথায় মুলতান সূর্য মন্দির আজও জীবন্ত এক প্রতীক—হিন্দু সভ্যতার সমৃদ্ধি, লুন্ঠন, ধর্মীয় অবমাননা এবং রাজনৈতিক কূটনীতির এক করুণ দলিল হিসেবে।
কৃষ্ণপুত্র শাম্ব ও মুলতানের আদি সূর্য মন্দিরের কিংবদন্তি
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মুলতানের সূর্য মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পুত্র শাম্বের নাম। কথিত আছে, শাম্ব কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন এবং এই ভয়াবহ রোগ থেকে মুক্তি পেতে তিনি সূর্যদেবের আরাধনায় ব্রতী হন। দীর্ঘ তপস্যা ও উপাসনার পর তিনি আরোগ্য লাভ করেন এবং সেই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পাকিস্তানের বর্তমান পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান অঞ্চলে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে এই আদি সূর্যমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
এই কিংবদন্তি শুধু ধর্মীয় কাহিনি নয়, সূর্য উপাসনা যে কত প্রাচীন এবং কত গভীরভাবে এই অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, তারও এক প্রতীকী প্রকাশ। শাম্বের এই কাহিনি ভারতের অন্যান্য সূর্য মন্দির যেমন কনাড়ক বা মুড়াদেবের কাহিনির সঙ্গেও এক সূক্ষ্ম থিম্যাটিক সাদৃশ্য তৈরি করে, যেখানে সূর্যকে আরোগ্যদাতা, জীবনদাতা ও রক্ষক হিসেবে দেখা হয়।
মুলতানের প্রাচীন নাম ‘মূলস্থান’ ও ‘কাশ্যপপুর’
মুলতান শহরের নামের উৎস নিয়েও রয়েছে আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, যে অংশে প্রাচীন সূর্য মন্দিরটি অবস্থিত ছিল, সেই স্থানের নাম ছিল “মূলস্থান” বা “মূলস্থানপুরী”। ক্রমে এই “মূলস্থান” থেকেই ‘মুলতান’ নামটির উৎপত্তি হতে পারে বলে অনেক গবেষকের ধারণা। যদিও এ নিয়ে মতভেদও রয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আজও হাতে আসে নি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল—মুলতান শহরের প্রাচীন নাম “কাশ্যপপুর” বলেও উল্লেখ পাওয়া যায় কিছু প্রাচীন গ্রন্থ ও বিবরণে। এই নামটি সম্ভবত ঋষি কাশ্যপের নাম থেকে উদ্ভূত, যা প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বৈদিক যুগের অনেক গভীরে প্রোথিত। গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের লেখাতেও মুলতান ও এর সূর্য মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায় বলে আধুনিক গবেষকেরা মত প্রকাশ করেছেন, যা এই মন্দিরটির প্রাচীনতা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির ইঙ্গিত দেয়।
বিদেশি ভ্রমণকারীদের চোখে মুলতান মন্দির
গ্রিক নৌপ্রধান সাইল্যাক্সের উল্লেখ
পঞ্চম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বে পারস্য সম্রাট দারিয়ুসের অধীনে কাজ করা গ্রিক নৌপ্রধান সাইল্যাক্স (Scylax of Caryanda) এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে নৌভ্রমণ করেন বলে উল্লেখ আছে। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে সিন্ধু ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তার প্রেক্ষিতে ধারণা করা হয় যে মুলতান ও তার বিখ্যাত সূর্য মন্দির সম্পর্কে তিনিও অবহিত ছিলেন এবং সম্ভবত মন্দিরটির আন্তর্জাতিক খ্যাতি তাঁর যুগেও সুপরিচিত ছিল।
হেরোডোটাসের বর্ণনা
“ইতিহাসের জনক” নামে পরিচিত গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসও তাঁর লেখায় এই অঞ্চলের সূর্য উপাসনার উল্লেখ করেছেন বলে গবেষকেরা ধারণা করেন। তাঁর সময় থেকে প্রায় ২৪০০ বছরেরও আগে মুলতান সূর্য মন্দিরের নাম প্রচারিত ছিল—এই তথ্য থেকেই বোঝা যায় এই তীর্থক্ষেত্রটি কতটা প্রাচীন, এবং কত আগে থেকে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সংস্কৃতির পথিকদের নজরে এসেছিল।
হিউয়েন সাং-এর চোখে স্বর্ণময় সূর্য মন্দির
চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভ্রমণকারী হিউয়েন সাং (Xuanzang) সপ্তম শতাব্দীতে ভারত ও আশপাশের অঞ্চল সফর করেন। ৬৪১ খ্রিষ্টাব্দের আশেপাশে তিনি মুলতানের সূর্য মন্দিরে এসেছিলেন বলে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লিখিত আছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মন্দিরে যে বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠিত ছিল তা ছিল খাঁটি সোনার তৈরি এবং ওই দেবমূর্তিটির চোখদুটি লাল চুনি দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল, যা সূর্যের দীপ্তিময় দৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত।
হিউয়েন সাং আরও জানান, মন্দিরের দরজা, স্তম্ভ, শিখর ও চূড়ায় সোনা, রূপো এবং মূল্যবান রত্নের বিপুল ব্যবহার দেখা যেত, যা মন্দিরটিকে শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রতিদিন সহস্রাধিক হিন্দু তীর্থযাত্রী এখানে এসে পূজা অর্চনা করতেন এবং তিনি নিজে ওই মন্দিরে দেবদাসীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করেন, যা প্রাচীন ভারতীয় মন্দির সংস্কৃতির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
হিউয়েন সাং-এর বর্ণনায় আরও জানা যায়, শুধু সূর্যদেব নয়, সেই মন্দির প্রাঙ্গণে শিব ও বুদ্ধের মূর্তিও ছিল। অর্থাৎ, এই মন্দিরটি শুধুমাত্র একক দেবতার আরাধনালয় নয়, বরং হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের এক সহাবস্থানের প্রতীকী ধর্মকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যা সেই সময়কার ধর্মীয় বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার ও একধরনের সহিষ্ণুতা ও আদান–প্রদানের পরিচায়ক।
উমায়াদ আক্রমণ ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের লুন্ঠন
অষ্টম শতাব্দীতে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় পরিবর্তন আসে আরব উমায়াদ খিলাফতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে। উমায়াদ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধু জয় করার পর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করেন এবং অষ্টম শতাব্দীতেই মুলতান অঞ্চল তাদের ক্ষমতার অধীনে চলে আসে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের বাহিনী মুলতান অধিকারের পর মুলতান সূর্য মন্দিরকে আক্রমণ করে এবং ভীষণ লুন্ঠন চালায়—এমন বর্ণনা বহু ঐতিহাসিক সূত্র ও পরবর্তী কালের বর্ণনায় পাওয়া যায়। কাসিম মন্দিরের বিপুল ধনসম্পদ লুন্ঠন করেন, মন্দিরের রক্ষকদের বন্দী করেন এবং মন্দিরের প্রধান সোনার বিগ্রহটিকে ধ্বংস বা ছিনিয়ে নিয়ে যান বলে প্রচলিত আছে।
মূর্তির অবমাননা ও গোমাংস ঝুলিয়ে দেওয়ার কাহিনি
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কেবল লুন্ঠন ও আক্রমণেই তাঁরা থেমে থাকেননি। হিন্দুধর্মকে অবমাননা ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সূর্য মন্দিরের দেবমূর্তির গলায় গোমাংসের টুকরো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও কথিত আছে। এই বর্ণনা ধর্মীয় বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক অপমান এবং মানসিকভাবে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখার কৌশলের এক নগ্ন উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে আমরা স্পষ্টভাবে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উদ্দেশ্যমূলক অপমানের অংশ হিসেবে দেখতে পারি, যা আধুনিক সময়ের কিছু ঘটনার সঙ্গেও বেদনাদায়ক সাদৃশ্য তৈরি করে—যেখানে প্রতিপক্ষ ধর্মের পবিত্র স্থান ও প্রতীককে আঘাত করা হয় রাজনৈতিক বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য।
সোনার মূর্তি থেকে কাঠের প্রতিমা: ধারাবাহিক উপাসনার চেষ্টা
লুন্ঠনের পরে মন্দিরের মূল সোনার প্রতিমা আর অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু স্থানীয় হিন্দুরা কেবল লুন্ঠনে হাল ছেড়ে দেননি। তারা পরবর্তীকালে সেখানে একটি কাঠের প্রতিমা স্থাপন করে সূর্যদেবের পূজা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, মন্দির কেবল ধনসম্পদের ভাণ্ডার ছিল না, বরং লোকজ বিশ্বাস, দৈনন্দিন ধর্মাচরণ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি কেন্দ্র ছিল।
এ সময়েই মুলতান শহরের বাজার এলাকার কাছে মুহাম্মদ বিন কাসিম একটি মসজিদ নির্মাণ করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, একই শহরে একদিকে ভগ্নপ্রায় বা লুন্ঠিত হিন্দু মন্দির, অন্যদিকে নতুন উদীয়মান ইসলামী ধর্মীয় স্থাপত্য—এই দ্বৈত অস্তিত্ব মুলতানের ধর্মীয় মানচিত্রকে এক নতুন আকার দিতে শুরু করে।
রাজনীতি ও কূটনীতির খেলায় মুলতান সূর্য মন্দির
মুলতান সূর্য মন্দির কেবল ধর্মীয় তীর্থ নয়; মধ্যযুগে এটি হয়ে উঠেছিল কূটনৈতিক দরকষাকষির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে যখন বিভিন্ন হিন্দু রাজা মুলতান অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালাতে চেয়েছেন, তখন মুলতানের শাসকেরা বারবার সূর্য মন্দিরকে “বন্দি” করে রেখেছেন রাজনৈতিক দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে।
যে কোনো হিন্দু রাজা যখন মুলতান জয়ের প্রস্তুতি নিতেন, তখন সেখানকার শাসকরা হুমকি দিত যে, আক্রমণ করলে সূর্য মন্দিরটি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। হিন্দু রাজারা সূর্য মন্দিরকে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন, ফলে এই হুমকির মুখে অনেকেই আক্রমণ থেকে বিরত থাকতেন বা আপস করে নিতেন। এর ফলে মন্দিরটি এক অদ্ভুত দ্বৈত ভূমিকা পায়—একদিকে এটি ভক্তজনের পূজাস্থল, অন্যদিকে সামরিক কূটনীতির “জিম্মি” কার্ড।
ইসমাইলি দখল, ভাঙচুর ও পুরোহিত নিধন
দশম শতাব্দীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরেকটি ঢেউ আসে মুলতানে। ইসমাইলি ফাতেমীয় মতাদর্শে অনুগত শক্তিরা মুলতান দখল করে। ক্ষমতা দখলের পর তারা সূর্য মন্দিরে ভয়াবহ আক্রমণ চালায় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই সময়ে মন্দিরের কাঠের বিগ্রহটি ভেঙে ফেলা হয় এবং অনেক পুরোহিতকে হত্যা করা হয়, ফলে মন্দিরের পূজা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ইসমাইলিরা শুধু মূর্তি ভেঙেই ক্ষান্ত হননি; তারা মন্দিরের স্থানে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করেন। এর ফলে সূর্য মন্দিরের স্থাপত্যিক অস্তিত্ব আরো এক ধাপ সঙ্কুচিত হয়ে যায় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এই তীর্থক্ষেত্র প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়তে শুরু করে।
গজনির মাহমুদ, মসজিদ রাজনীতি ও মন্দিরের পরিণতি
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পালাবদলে মুলতানের ইতিহাসে আবির্ভূত হন গজনির মাহমুদ—উপমহাদেশে অসংখ্য হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ, লুন্ঠন ও ধ্বংসের জন্য কুখ্যাত এক শাসক। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর তিনি ইসমাইলিদের নির্মিত নতুন মসজিদটিকে বন্ধ করে দেন এবং শুক্রবারের জামায়াতের জন্য পুরনো মসজিদটিকেই চালু রাখেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। এর ফলস্বরূপ ইসমাইলি মসজিদ ধীরে ধীরে জীর্ণ ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
কথিত আছে, ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে গজনির মাহমুদই মুলতান সূর্য মন্দিরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানত সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের জন্য বেশি আলোচিত করা হয়, গবেষকরা মনে করেন মুলতানের সূর্য মন্দির ধ্বংসেও তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে একের পর এক আক্রমণ, লুন্ঠন, ধর্মীয় দখল ও প্রতীকী ধ্বংসের মধ্য দিয়ে মুলতান সূর্য মন্দির ধীরে ধীরে ইতিহাসের আড়ালে মিলিয়ে যায়।
আল বিরুনির দৃষ্টিতে মুলতান সূর্যমন্দিরের অবসান
প্রখ্যাত পারস্য পণ্ডিত ও ভ্রমণকারী আল বিরুনি একাদশ শতাব্দীতে ভারত ও আশেপাশের অঞ্চলসমূহ ঘুরে দেখেন এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে ভারতীয় সমাজ, ধর্ম ও ভূগোল সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ দেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর যুগে হিন্দু তীর্থযাত্রীরা আর মুলতানের সূর্য মন্দিরে আসতেন না। কারণ তখন পর্যন্ত মন্দিরটি কার্যত পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং একে তীর্থক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না।
আল বিরুনি মুলতান সূর্য মন্দিরের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যায়, তিনি মন্দিরের পূর্বতন ঐশ্বর্য, বিস্তৃতি ও ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন, কিন্তু তাঁর সময়ে মন্দিরটির আর তেমন স্থায়ী স্থাপত্যিক অবশেষ ছিল না। অর্থাৎ, তাঁর বর্ণনা একদিকে ইতিহাসের দলিল, অন্যদিকে মন্দিরটির পতন ও অবলুপ্তির প্রত্যক্ষ সাক্ষীস্বরূপ।
স্থাপত্যিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য: সোনালি গম্বুজের তীর্থ
বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও তীর্থবৃত্তান্তের সম্মিলিত বিবরণ থেকে মুলতান সূর্য মন্দিরের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। মন্দিরটির প্রধান গর্ভগৃহে ছিল সোনার নির্মিত সূর্যদেবের বিগ্রহ, যার চোখে বসানো ছিল লাল চুনি বা রুবি, যা সূর্যের অগ্নিময় উজ্জ্বলতার রূপক হিসেবে বিবেচিত হত।
মন্দিরের প্রবেশদ্বার, অলিন্দ, স্তম্ভ, প্রাচীর ও শিখরে সোনা, রূপো, ব্রোঞ্জ ও বিভিন্ন রত্নখচিত অলংকরণের ব্যবহার ছিল। এমনকি মন্দিরের চূড়া নাকি দূর থেকে ঝলমল করে দেখা যেত বলে বর্ণনা পাওয়া যায়, যা মুলতান শহরের দিকে আসা বণিক ও যাত্রীদের জন্য এক ধরনের দিকনির্দেশক চিহ্ন হিসেবেও কাজ করত। এভাবে ধর্মীয় পবিত্রতা ও বাণিজ্য পথ—দুয়ের মাঝখানে মন্দিরটি এক কার্যকর সংযোগ রেখা তৈরি করেছিল।
মন্দিরে দেবদাসীদের উপস্থিতি, বিভিন্ন দেবদেবীর (বিশেষত শিব ও বুদ্ধ) প্রতিমা, এবং প্রতিদিনের আচার–অনুষ্ঠান মিলিয়ে এটি ছিল একটি জটিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যেখানে সঙ্গীত, নৃত্য, দান–দক্ষিণা, যজ্ঞ, দর্শন ও সামাজিক যোগাযোগ সবকিছুই একত্রে চলত। এটা স্পষ্ট যে, মুলতান সূর্য মন্দির ছিল শুধুই পূজাস্থল নয়; বরং ছিল এক বৃহৎ সংস্কৃতিকেন্দ্র।
ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতির মিলনবিন্দু
মুলতান সূর্য মন্দিরকে যদি একক কোনও পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তার গুরুত্বকে খর্ব করা হবে। এই মন্দির তিনটি স্তরে গুরুত্ব বহন করেছে—ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আর্থিক। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল সূর্যদেবের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র; রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল হিন্দু রাজাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশলী অস্ত্র; আর্থিক দিক থেকে এটি ছিল বিপুল ধনসম্পদের ভাণ্ডার ও তীর্থযাত্রী নির্ভর আয়ের উৎস।
উমায়াদ, ইসমাইলি ও গজনভিদের পরপর আক্রমণ ও দখল প্রমাণ করে যে, মুলতান সূর্য মন্দিরকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থাপনা দখল করা নয়; বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক–রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাই বিভিন্ন সাম্রাজ্যের কাছে মন্দিরটি ছিল কাঙ্ক্ষিত টার্গেট, আর স্থানীয় হিন্দু সমাজের কাছে ছিল প্রতিরোধের প্রতীক।
ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও প্রতীকি ধ্বংসের পাঠ
মুলতান সূর্য মন্দিরের ইতিহাস আমাদের সামনে বারবার এক কঠোর সত্য উন্মোচন করে: ধর্মীয় প্রতীক, বিশেষত মন্দির–মসজিদ–গির্জা–স্তূপ ইত্যাদি, প্রায়ই শুধুই আধ্যাত্মিকতার স্থান হিসেবে থেকে যায় না; তারা ক্ষমতার প্রতীক, পরিচয়ের প্রতীক এবং রাজনৈতিক অনুগত্য পরিমাপের উপকরণ হয়ে ওঠে। মুলতান সূর্য মন্দিরকে বারবার আক্রমণ করা হয়েছে ঠিক এই কারণেই—একে ধ্বংস করে প্রতিপক্ষের বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও সাহস ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
দেবমূর্তির গলায় গোমাংস ঝুলিয়ে দেওয়ার কাহিনি, বিগ্রহের ভাঙচুর, পুরোহিতদের হত্যা, মন্দিরের ধনরত্ন লুন্ঠন—সবই একই পাঠ শেখায়: ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যখন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সে কেবল সংস্কৃতি নয়, ইতিহাসকেও বিকৃত করে দেয়। আধুনিক যুগের নানা ঘটনায় যখন একই ধরনের প্রতীকি অপমান ও ধ্বংসের চিত্র সামনে আসে, তখন মুলতানের সূর্য মন্দিরের ইতিহাস যেন পুনরায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং আমাদের সতর্ক করে।
মন্দিরের সঠিক অবস্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনিশ্চয়তা
আজকের দিনে একটি অন্যতম বড় প্রশ্ন হল—মুলতান সূর্য মন্দিরটি ঠিক কোথায় অবস্থিত ছিল? বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, স্থানীয় কাহিনি ও গবেষণামূলক প্রবন্ধে নানা মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, বর্তমান মুলতান শহরের সিটাডেল বা পুরনো দুর্গ এলাকার আশেপাশে এর অবস্থান ছিল; কেউ আবার শহরের অন্য প্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
“মূলস্থান” নামে যে অংশের কথা বলা হয়, সেই অঞ্চলটির সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করা যায়নি। এছাড়া বারবার আক্রমণ, ধর্মীয় স্থাপত্যের রদবদল, নতুন নির্মাণ, ভাঙচুর, এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে প্রাচীন মন্দিরের দৃষ্টিগোচর কোনও স্থাপত্য অবশেষ আজ আর সহজে শনাক্ত করা যায় না। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুলতান সূর্য মন্দির একটি চ্যালেঞ্জিং ও বিতর্কিত গবেষণার ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে।
আজকের মুলতান ও স্মৃতির ভগ্নস্তূপ
আজকের পাকিস্তানের মুলতান মূলত সুফি দরগাহ, মাজার ও ইসলামি স্থাপত্যের জন্য বেশি পরিচিত—“শহরে আউলিয়া” হিসেবে এর খ্যাতি বিস্তৃত। কিন্তু এই আধুনিক ইসলামী পরিচয়ের আড়ালেও লুকিয়ে আছে বহু পূর্বের সূর্য উপাসনার একটি দীর্ঘ ইতিহাস, যা আজ কেবল কিছু ভগ্নস্তূপ, লোককথা, প্রাচীন গ্রন্থের টুকরো–টাকরা উল্লেখ এবং গবেষণালব্ধ অনুমান-নির্ভর ব্যাখ্যার মধ্যে টিকে আছে।
কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ও সাম্প্রতিক আলোচনায় মুলতানের কোনো একটি পুরনো ধ্বংসস্তুপকে এই সূর্য মন্দিরের অবশেষ হিসেবে দাবি করা হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে সেসব স্থানের সঙ্গে প্রাচীন সূর্য মন্দিরের সরাসরি সম্পর্ক এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলেই ধরা হয়। তবুও ছবিতে দেখা পোড়া ইটের ভাঙা গম্বুজ, জীর্ণ প্রাচীর, অতীতের ধ্বংসস্তুপ—এসব দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, এই শহরের মাতৃগর্ভে বহু প্রাচীন সভ্যতা ও ধর্মীয় স্থাপত্যের অনিবার্য উপস্থিতি রয়েছে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা
মুলতান সূর্য মন্দিরের ইতিহাস কেবল একজন হিন্দু ভক্তের জন্য, বা একজন ইতিহাস গবেষকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি প্রাসঙ্গিক যে কোনো মানুষ ও সমাজের জন্য, যারা ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব বোঝেন। এই মন্দিরের পতনের পেছনে রয়েছে বারবার ধর্মীয় বিদ্বেষ, রাজনৈতিক লোভ ও অর্থনৈতিক হিংস্রতা। সেই সঙ্গে রয়েছে সাধারণ মানুষের অসহায়তা, যাদের তীর্থক্ষেত্র, স্মৃতি ও পরিচয় একে একে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সময়ে যখন ধর্মের নামে বিভাজন, হিংসা ও প্রতীকি আঘাত বেড়ে চলেছে, তখন মুলতানের সূর্য মন্দিরের ইতিহাস আমাদের সামনে এক সতর্ক বার্তা রেখে যায়—ধ্বংসের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও উপকারে আসে না। একটি মন্দির, একটি গির্জা বা একটি মসজিদ ভেঙে দেওয়া মানে শুধু ইট–গাঁথনি ভাঙা নয়, বরং শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতি, স্মৃতি ও বিশ্বাসকে হত্যা করা।
উপসংহার: ভগ্ন মন্দির, অমর স্মৃতি
আজ আর মুলতান সূর্য মন্দিরের স্বর্ণমণ্ডিত শিখর আকাশে দীপ্তি বিলায় না; হিউয়েন সাং-এর দেখা দেবদাসীরা নেই, নেই সহস্র তীর্থযাত্রীর পদচারণা। কিন্তু ইতিহাস ও স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে এই মন্দির আজও বেঁচে আছে। প্রতিটি লুন্ঠন, প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি অবমাননার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি সভ্যতাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায় না, যতবারই তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা হোক না কেন।
মুলতান সূর্য মন্দির আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত, কিন্তু তার কাহিনি অমর। এই কাহিনি আমাদের শিখিয়ে যায় সহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্য কতটা গভীর। একই সঙ্গে এই কাহিনি আমাদের সতর্ক করে দেয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা স্তূপকে ক্ষমতার লালসার বলি হতে না হয়। ইতিহাসের ক্ষতকে স্মরণ রেখে, ভবিষ্যতের জন্য সহাবস্থানের এক নতুন পথ গড়ে তোলাই হতে পারে এ গল্প থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
