একাদশী: পুরো বছরের নাম, সময় ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

একাদশী মাহাত্ম্য – রঞ্জিত বর্মন

🌸 একাদশী: পুরো বছরের নাম, সময় ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা 🌸

✍️ লেখক: রঞ্জিত বর্মন | 🕉️ Sanatan Dharma Hindu news 🌿

হিন্দু চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে প্রতি মাসে দুইটি একাদশী তিথি হয় — একবার শুক্লপক্ষ এবং একবার কৃষ্ণপক্ষ। মোট বছরে সাধারণত ২৪টি একাদশী থাকে। একাদশী পালন করলে পাপ নষ্ট হয়, আত্মা-মন-শরীর শুদ্ধ হয় এবং ঈশ্বরের করুণা লাভ হয়।

🪔 বছরের ২৪টি একাদশীর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ

১. উৎপন্না একাদশী (অগ্রহায়ণ, কৃষ্ণপক্ষ): এটি বছরের প্রথম একাদশী। এই তিথিতে একাদশী দেবী শ্রীবিষ্ণুর শরীর থেকে উৎপন্ন হয়ে অসুর বিনাশ করেছিলেন। এটি পালনে সর্বপাপ নাশ হয়।
২. মোক্ষদা একাদশী (অগ্রহায়ণ, শুক্লপক্ষ): এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দান করেন। এটি মোক্ষ লাভের শ্রেষ্ঠ তিথি এবং পিতৃপুরুষদের উদ্ধারের পথ।
৩. সফলা একাদশী (পৌষ, কৃষ্ণপক্ষ): এই ব্রত পালনে জীবনের সকল কাজে সফলতা আসে এবং দুর্ভাগ্য দূর হয়।
৪. পুত্রদা একাদশী (পৌষ, শুক্লপক্ষ): সুসন্তান লাভ এবং সন্তানের মঙ্গলের জন্য এই ব্রত অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ।
৫. ষটতিলা একাদশী (মাঘ, কৃষ্ণপক্ষ): তিল দ্বারা পূজা ও দানের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধি ঘটে এবং অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়।
৬. ভৈমী বা জয়া একাদশী (মাঘ, শুক্লপক্ষ): এই ব্রত পালনে পিশাচত্ব বা নিচ যোনি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৭. বিজয়া একাদশী (ফাল্গুন, কৃষ্ণপক্ষ): কঠিন বাধা ও শত্রুর বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে শ্রীরামচন্দ্র এই ব্রত পালন করেছিলেন।
৮. আমলকী একাদশী (ফাল্গুন, শুক্লপক্ষ): আমলকী গাছের নিচে বিষ্ণুর আরাধনা করলে বৈকুণ্ঠ ধাম প্রাপ্তি হয়।
৯. পাপমোচনী একাদশী (চৈত্র, কৃষ্ণপক্ষ): সকল প্রকার জঘন্য পাপ থেকে মুক্তি লাভের জন্য এই ব্রত অদ্বিতীয়।
১০. কামদা একাদশী (চৈত্র, শুক্লপক্ষ): এটি ভক্তের সকল শুভ কামনা বা বাসনা পূর্ণ করে।
১১. বরুথিনী একাদশী (বৈশাখ, কৃষ্ণপক্ষ): এই ব্রত পালনে অশেষ সৌভাগ্য এবং আজীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি মেলে।
১২. মোহিনী একাদশী (বৈশাখ, শুক্লপক্ষ): মোহ ও মায়া কাটিয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের জন্য এই ব্রত প্রশস্ত।
১৩. অপরা একাদশী (জ্যৈষ্ঠ, কৃষ্ণপক্ষ): অপরিমিত পুণ্য ও যশ লাভের জন্য এই একাদশী পালন করা হয়।
১৪. নির্জলা একাদশী (জ্যৈষ্ঠ, শুক্লপক্ষ): জল পান না করে এই ব্রত করলে বছরের সব একাদশীর সমান ফল পাওয়া যায়।
১৫. যোগিনী একাদশী (আষাঢ়, কৃষ্ণপক্ষ): শারীরিক রোগ-ব্যাধি (বিশেষ করে চর্মরোগ) থেকে মুক্তির জন্য এই ব্রত ফলদায়ক।
১৬. শয়নী একাদশী (আষাঢ়, শুক্লপক্ষ): এই দিন থেকে ভগবান বিষ্ণু চার মাসের জন্য নিদ্রায় যান এবং চর্তুমাস্য ব্রত শুরু হয়।
১৭. কামিকা একাদশী (শ্রাবণ, কৃষ্ণপক্ষ): এটি পালনে পিতৃপুরুষেরা তৃপ্ত হন এবং বাজপেয় যজ্ঞের ফল পাওয়া যায়।
১৮. পবিত্রারোপণী একাদশী (শ্রাবণ, শুক্লপক্ষ): ভক্তি বৃদ্ধি ও চিত্ত শুদ্ধির জন্য এই ব্রত পালন করা হয়।
১৯. অজয়া বা অন্নদা একাদশী (ভাদ্র, কৃষ্ণপক্ষ): রাজা হরিশচন্দ্র এই ব্রত পালনে তাঁর হারানো রাজ্য ও পরিবার ফিরে পেয়েছিলেন।
২০. পার্শ্ব একাদশী (ভাদ্র, শুক্লপক্ষ): নিদ্রিত বিষ্ণু এই দিনে পাশ ফেরেন, যা ভক্তের ভাগ্যের শুভ পরিবর্তনের প্রতীক।
২১. ইন্দিরা একাদশী (আশ্বিন, কৃষ্ণপক্ষ): মৃত পূর্বপুরুষদের নরক থেকে উদ্ধার করার জন্য এটি পালন করা হয়।
২২. পাশাঙ্কুশা একাদশী (আশ্বিন, শুক্লপক্ষ): যমরাজের শাস্তি থেকে মুক্তি ও পরলোকে পরম শান্তি লাভের ব্রত।
২৩. রমা একাদশী (কার্তিক, কৃষ্ণপক্ষ): দীপাবলির আগে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ ও ঐশ্বর্য লাভের জন্য এই ব্রত।
২৪. প্রবোধিনী একাদশী (কার্তিক, শুক্লপক্ষ): ভগবান বিষ্ণু চার মাস পর জেগে ওঠেন। এই দিন থেকে সকল শুভ কাজ শুরু হয়।

📜 অতিরিক্ত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও পালন বিধি

১. কেন চাল ও শস্য বর্জনীয়? ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ অনুসারে, একাদশীর দিনে সকল পাপ শস্যের মধ্যে আশ্রয় নেয়। তাই এই দিনে অন্ন, ডাল বা শস্য খেলে সেই পাপ সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে বলে মনে করা হয়।

২. বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: একাদশীর তিথিতে চন্দ্রের আকর্ষণে পৃথিবীতে জলীয় অংশের চাপ বাড়ে। উপবাস করলে শরীরের মেটাবলিজম ঠিক থাকে এবং মস্তিষ্ক শান্ত থাকে।

৩. পারণের গুরুত্ব: একাদশীর পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে (পঞ্জিকা অনুযায়ী) পারণ করা বাধ্যতামূলক। পারণ না করলে ব্রত পূর্ণ হয় না।

৪. শিশুদের শিক্ষা: শিশুদের শৈশব থেকেই একাদশী সম্পর্কে জানানো উচিত যাতে তারা সংযম ও ভক্তি শেখে। তবে শিশুদের জন্য কঠোর উপবাসের বদলে অনুকল্প (ফলমূল, মিষ্টি) দিয়ে অভ্যাস করানো শ্রেয়।

© 2025 – রঞ্জিত বর্মন। সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।

Leave a Comment