পটুয়াখালীর বাউফলে হিন্দু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ: ধূলিয়া ইউনিয়নে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের বড় প্রশ্ন
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্পত্তি দখল ও নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘদিনের সংকটকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
মোঃ হারুন কারী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধূলিয়া ইউনিয়নের একটি হিন্দু পরিবারের পৈতৃক জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার প্রাথমিক প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের সারাংশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যানুসারে, পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নে বসবাসরত এক হিন্দু পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোগ করা পৈতৃক জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মোঃ হারুন কারী, যিনি এর আগেও একই এলাকায় একাধিক হিন্দু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য ভূমিদস্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সংশ্লিষ্ট হিন্দু পরিবারটি দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও কৃষিজমি ভোগদখল করে আসছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জমি দখলের পাঁয়তারা এবং কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা বদলের উদ্যোগ দেখা যায়।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, প্রভাব খাটিয়ে এবং বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করে মোঃ হারুন কারী ও তার সহযোগীরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, ওয়ারিশ সনদে জালিয়াতি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল অবলম্বন করে জমি দখলের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ধূলিয়া ইউনিয়ন, বাউফল: ভূমিদস্যুতা ও সংখ্যালঘু আতঙ্কের পটভূমি
বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নের ঘুরচাকাঠী গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় বিগত কয়েক বছর ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি নিয়ে বিরোধ, দখলচেষ্টা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের নানা অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, ঘুরচাকাঠী গ্রামে প্রায় ৩০টি হিন্দু পরিবার তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছাড়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, কারণ স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র তাদের জমি দখলের জন্য নানামুখী চাপ সৃষ্টি করছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন একই ব্যক্তি হারুন কারী।
অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি, সামাজিক বয়কট, মিথ্যা মামলা, দলিলের ফাঁকফোকর এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যবহার করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে প্রথমে আর্থিকভাবে দুর্বল করে, পরে আইনি লড়াইয়ে ক্লান্ত করে জমি ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।
এভাবে একই এলাকায় বারবার সংখ্যালঘুদের জমি দখল, মামলার হয়রানি এবং দেশত্যাগের মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠায় ধূলিয়া ইউনিয়নকে এখন অনেকেই সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ভূমিদস্যুতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে দেখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় ও জনমতের প্রতিক্রিয়া
ধূলিয়া ইউনিয়নের সাম্প্রতিক জমি দখলের অভিযোগের ভিডিও ও তথ্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ–বিদেশের অনেক বাংলাদেশি ব্যবহারকারীর মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত বিভিন্ন সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকেরা মন্তব্যে লিখছেন, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার পরও যদি প্রশাসন দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয়, অনিরাপত্তা ও দেশত্যাগের প্রবণতা আরও বাড়বে।
অনেকেই এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করছেন; অন্যদিকে কিছু মন্তব্যে বলা হচ্ছে, সকল পক্ষের কাগজপত্র ও সাক্ষ্য–প্রমাণ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য নিরূপণ করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার হওয়া পোস্টগুলোর বেশিরভাগেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে এমন অভিযোগ এখন খুব অল্প সময়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, বাস্তবে আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কত দ্রুত ও কার্যকর হয়, তা নিয়েই বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিকরা।
বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের শাসন ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান অধিকার ও আইনের সমান সুরক্ষা প্রদানের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পত্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রকে সরাসরি দায়িত্বশীল করে।
কিন্তু বাস্তবে হিন্দুসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই চলমান, এবং এসব ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার হার খুবই কম বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্পিত সম্পত্তি বা শত্রু সম্পত্তি আইনের অপব্যবহার, ভূমি প্রশাসনের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুল পরিমাণ জমি বেদখলে চলে গেছে—এই প্রসঙ্গ প্রতিনিয়ত গবেষণা ও আলোচনায় উঠে আসছে।
অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত বহু জমি মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্বল ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে দখল করা হয়েছে, এবং রাজনৈতিক দলাবলি নির্বিশেষে প্রভাবশালী মহল এসব দখল থেকে সুবিধা নিয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ আছে।
এ অবস্থায় ধূলিয়া ইউনিয়নের মতো সাম্প্রতিক ঘটনার প্রতিটি অভিযোগকে পরীক্ষার কেস হিসেবে নিয়ে দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং ভূমি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পটুয়াখালী অঞ্চলে সংখ্যালঘু জমি দখলের পুনরাবৃত্ত অভিযোগ
শুধু বাউফল নয়, পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখল, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ একাধিকবার সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
কোথাও হিন্দু পরিবারের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মালামাল লুট করার অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও মিথ্যা কাগজপত্র দেখিয়ে রেকর্ডভুক্ত জমি আত্মসাৎ করার চেষ্টা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
কেউ কেউ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে, কেউ মানববন্ধন-পথসভা করে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে তাদের ওপর হওয়া হামলা, ভয়ভীতি ও জমি দখলের চেষ্টার কথা জানাতে বাধ্য হয়েছেন।
এই ধারাবাহিকতার ভেতরেই ধূলিয়া ইউনিয়নের সাম্প্রতিক ঘটনাকে অনেকে বৃহত্তর পটুয়াখালী অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের জমি দখল ও নিরাপত্তাহীনতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন, যা প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস ও গঠনগত কারণ
বাংলাদেশে হিন্দুসহ নানা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, জমি দখল ও জিম্মি করে রাখা পরিস্থিতির শিকড় পাকিস্তান আমলের শত্রু সম্পত্তি আইন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরবর্তী নানা সময় পর্যন্ত বিস্তৃত বলে গবেষকরা মত দিয়েছেন।
অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত বহু জমি আসলে বাস্তবে বসবাসরত ও ভোগদখলকারী হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় জোরপূর্বক, প্রতারণা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে দখল করা হয়েছে—এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ রয়েছে, অর্পিত সম্পত্তি দখল থেকে সর্বোচ্চ সুবিধাভোগীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা প্রমাণ করে যে সংখ্যালঘু জমি দখলের পেছনে কেবল ব্যক্তি স্বার্থ নয়, বরং সংগঠিত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংগঠন ও জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনী বিরোধ ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সম্পত্তি দখলের ঘটনা বেড়েছে, যা অনেককে দেশত্যাগে বাধ্য করার এক ধরনের কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
ধূলিয়া ইউনিয়নের জমি দখল ইস্যুতে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে বলা হচ্ছে, এই ধরনের অভিযোগ শুধু ফেসবুকে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ নথিভুক্ত, তদন্ত এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
বহু মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্যাতন, জমি দখল ও হামলার ঘটনা অনুসন্ধান ও নথিভুক্ত করার জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন প্রয়োজন, যাতে প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনিক অদক্ষতা বা পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতিত পরিবারগুলোকে দৃশ্যমান করে এবং প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করে, যেমন বাউফলের বিভিন্ন গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়গুলো জাতীয় আলোচনায় এসেছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কেবল সংবাদ প্রকাশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়ের মাধ্যমে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হলেও, দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত পরিবর্তন, আইনি সংস্কার ও বিচারহীনতার অবসান ছাড়া বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলানো সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ধূলিয়া ইউনিয়নের ঘটনাকেও তারা একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখছেন, যেখানে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলা পরিচালনার স্বচ্ছতা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে অন্যদের জন্যও একটি বার্তা যাবে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও করণীয়
ধূলিয়া ইউনিয়নের সাম্প্রতিক ঘটনায় এখনো পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা না গেলেও, জনমতের চাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার কারণে তাদের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বেড়েছে।
ভূমি বিরোধ, জমি দখল ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দেন—যেমন, জরুরি ভিত্তিতে ঘটনা স্থলে তদন্ত টিম পাঠানো, উভয় পক্ষের কাগজপত্র ও দখল পরিস্থিতি যাচাই, ভিডিও–ছবি–সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত রিপোর্ট তৈরি।
এছাড়া ভুক্তভোগী পরিবার যেন মামলা করতে, থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে বা আদালতে মামলা পরিচালনা করতে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও উভয় সম্প্রদায়ের শান্তিপ্রিয় মানুষের অংশগ্রহণে সালিশি বা সমঝোতার আয়োজন অনেক সময় সাময়িক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখলেও, যেখানে অপরাধ প্রমাণিত, সেখানে ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ এড়ানো যাবে না—এমন মতও রয়েছে।
একই সঙ্গে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনকে ডিজিটাল রেকর্ড, অনলাইন নামজারি, দলিল যাচাইয়ের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির সুযোগ কমিয়ে আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ধূলিয়ার মতো জমি দখলের অভিযোগ কমে আসে।
সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা
বাংলাদেশ বহু ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মিলিত আবাসভূমি, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে—এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার শর্তই হলো সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ধূলিয়া ইউনিয়নের মতো ঘটনা যখন সামনে আসে, তখন শুধু একটি পরিবারের জমি দখল নয়, বরং পুরো এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থানের ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যা যে কোনো সভ্য সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পুনরাবৃত্ত হামলা, জমি দখল বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা যদি দায়মুক্তি পেয়ে যায়, তাহলে তা ধীরে ধীরে একটি ‘নর্ম’ বা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, যা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় পর্যায়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে, দোষীদের আইন অনুযায়ী শাস্তি পেলে এবং ভুক্তভোগীরা তাদের পৈতৃক জমি ও ভিটেমাটিতে নিরাপদে বসবাস করতে পারলে তা সমাজে ইতিবাচক বার্তা পাঠায়, যা অন্য এলাকাতেও সংখ্যালঘুদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
এই কারণেই মানবাধিকারকর্মী, সচেতন নাগরিক ও প্রগতিশীল মহল মনে করেন, ধূলিয়া ইউনিয়নের সাম্প্রতিক অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো অঞ্চলের সম্প্রীতি ও আইনের শাসনের জন্যও জরুরি।
উপসংহার: ধূলিয়া থেকে শিক্ষা, ভবিষ্যতের পথরেখা
পটুয়াখালীর বাউফলের ধূলিয়া ইউনিয়নে হিন্দু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ, হারুন কারীর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগসমূহ এবং পটুয়াখালী অঞ্চলে সংখ্যালঘু জমি দখলের ধারাবাহিকতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, এটি শুধু একটি স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং আইনের শাসন, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার জাতীয় সংকটের অংশ।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ভুক্তভোগী পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা, ভুয়া কাগজপত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহার থাকলে তা শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
দীর্ঘমেয়াদে অর্পিত সম্পত্তি আইনসহ ভূমি সংশ্লিষ্ট নানা জটিলতা নিরসন, ডিজিটাল রেকর্ড ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রসার, সংখ্যালঘু নির্যাতনবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন—এ কথা বিভিন্ন গবেষণা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে বারবার উঠে এসেছে।
ধূলিয়া ইউনিয়নের ঘটনাটি যদি আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়, তবে এটি ভবিষ্যতে ভূমিদস্যুতা ও সংখ্যালঘু জমি দখলের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা পাঠাতে পারে; আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে তা আরও অনেক দুর্বল ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করবে।
বাংলাদেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বহু ধর্ম–সংস্কৃতির সহাবস্থানের ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এখন সময় এসেছে, ধূলিয়ার মতো প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রমাণ করার যে, এই দেশের কোনো নাগরিক, বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা, নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকবে না।
লেখক: রঞ্জিত বর্মন
