কবিয়াল অসীম সরকার: প্রতিভা, লোকসংস্কৃতি ও প্রথাগত শিক্ষার সীমা অতিক্রম করা এক জীবন্ত উত্তরাধিকার
বিশেষ বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ | লেখক: রঞ্জিত বর্মন
বলতে দ্বিধা নেই—এই লেখাটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বনের উদ্দেশ্যে লেখা নয়। কোনো নির্দিষ্ট দল, কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা কোনো ক্ষমতার কেন্দ্রকে তুষ্ট করা এর লক্ষ্য নয়। বরং এই লেখা আমাদের এক বৃহত্তর এবং গভীরতর মানবিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রশ্নটি হলো—প্রতিভা কি কেবল প্রথাগত শিক্ষার চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি? জ্ঞান কি শুধুই প্রাতিষ্ঠানিক সনদের কালিতে লেখা থাকে? নাকি সভ্যতার আসল ধারক-বাহক সেই মানুষরাই, যাঁরা কোনো বড় ডিগ্রি ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোর পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন?
এই চিরন্তন সত্যের আধুনিক উদাহরণ খুঁজতে গেলে আজ কবিয়াল অসীম সরকারের নাম অনিবার্যভাবে সবার আগে চলে আসে। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতির এক চলমান অভিধান। নদীয়া জেলার হরিণঘাটার কাদা-মাটি মেখে বড় হওয়া এই মানুষটি আজ প্রমাণ করেছেন যে, লোকসংস্কৃতি কখনও প্রান্তিক হতে পারে না; বরং এটিই হলো একটি জাতির শ্রেষ্ঠ দর্শন।
১. শিকড়ের টান: নদীয়ার মাটি থেকে বিশ্বমঞ্চে
বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। লালন ফকির থেকে শুরু করে বিজয় সরকার, নিতাই বৈরাগী কিংবা রাধারমণ দত্ত—যাঁরা প্রথাগত উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি ছাড়াই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। অসীম সরকার সেই মহান ধারারই বর্তমান সময়ের প্রধান প্রতিনিধি।
মতুয়া দর্শনের পুণ্যভূমি নদীয়া থেকে উঠে আসা অসীম সরকারের কবিগান কেবল সুরের খেলা নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক জাগরণ। তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে ছিল গ্রামীণ বাংলার লোকগাঁথা, পুরাণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। এই পরিবেশই তাঁকে এমন এক জীবনমুখী শিক্ষা দিয়েছে যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পাওয়া সম্ভব নয়।
২. প্রথাগত ডিগ্রি বনাম অর্জিত জ্ঞান: একটি তুলনামূলক আলোচনা
আজকাল অসীম সরকারকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ দেখা যায়। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁকে ‘অশিক্ষিত’ তকমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বলা হয়, তিনি চতুর্থ শ্রেণীও পাশ করেননি। কিন্তু যারা এই অভিযোগ করেন, তারা কি জানেন ‘জ্ঞান’ এবং ‘শিক্ষা’র মৌলিক পার্থক্য কী?
অসীম সরকারের জ্ঞান বইনির্ভর নয়, তা স্মৃতি এবং বোধনির্ভর। তাঁর মস্তিস্কে রয়েছে হাজার হাজার শ্লোক, ইতিহাস, সামাজিক তথ্য এবং দার্শনিক যুক্তি। কবিগানের মঞ্চে যখন তিনি বিরতিহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন, তখন তাঁর মুখ থেকে যে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বেরিয়ে আসে, তা কোনো পিএইচডি হোল্ডারের গবেষণাপত্রের চেয়ে কম কিছু নয়। তিনি ইতিহাস মুখস্থ করেন না, বরং ইতিহাসকে ধারণ করেন।
৩. কবিগান: মেধা ও উপস্থিত বুদ্ধির চরম পরীক্ষা
কবিগানকে অনেকে সাধারণ পল্লীগীতি বা হালকা বিনোদন মনে করেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কবিগান হলো এক অনন্য ‘ইন্টেলেকচুয়াল আর্ট’। এখানে শিল্পীকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিপক্ষের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় ছন্দে ছন্দে। এখানে নেই কোনো পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট, নেই কোনো প্রম্পটার।
অসীম সরকার এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন প্রশ্ন তোলেন— “কে বড়, রাধা না কৃষ্ণ? প্রেম বড় নাকি ত্যাগ?”—তখন তিনি শুধু পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা করেন না, বরং তার মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন ও বর্তমান সমাজ বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করেন। এই যে উপস্থিত বুদ্ধি এবং যুক্তিনির্ভর তর্ক করার ক্ষমতা—এটিই তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ ‘কবিয়াল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৪. উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা ও ভারত-বিভাজন
অসীম সরকারের গানের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে দেশভাগের ক্ষত এবং উদ্বাস্তু জীবনের হাহাকার। তিনি সেইসব মানুষের প্রতিনিধি যারা শিকড় ছিঁড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর গানে যখন ভিটেমাটি হারানোর বেদনা ফুটে ওঠে, তখন তা কেবল সুর থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি ঐতিহাসিক দলিল। লিখিত ইতিহাস অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, কিন্তু অসীম সরকারের মতো শিল্পীদের গানে সাধারণ মানুষের যে চোখের জল ঝরে পড়ে, তা সবসময় সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
৫. হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের দর্শন ও সামাজিক সাম্য
অসীম সরকারের শিল্পীসত্তার মূল ভিত্তি হলো মতুয়া দর্শন। শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাম্যবাদী চেতনাকে তিনি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর কবিগানে বর্ণবাদ বিরোধী অবস্থান, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং শিক্ষার গুরুত্ব বার বার উঠে আসে। তিনি সাধারণ মানুষকে শিখিয়েছেন যে, ভক্তি কেবল মন্দিরে নয়, বরং মানুষের সেবার মধ্যেই আসল ধর্ম নিহিত।
৬. আধুনিক ডিজিটাল যুগে লোকসংস্কৃতির প্রদীপ
অনেকে মনে করেন আধুনিকতার চাপে লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। কিন্তু অসীম সরকার প্রমাণ করেছেন যে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানলে লোকসংস্কৃতি আরও বেশি শক্তিশালী হতে পারে। আজ ইউটিউব এবং ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর গান বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালি শুনছে। নতুন প্রজন্ম, যারা হয়তো কবিগানের নামও জানত না, তারা অসীম সরকারের ‘যুক্তি-তর্ক’ শুনে মোহিত হচ্ছে। এটি একটি বিশাল সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
৭. কেন অসীম সরকারকে রক্ষা করা জরুরি?
মতভেদ থাকতেই পারে। একজন মানুষের রাজনৈতিক বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আপনার অমিল হতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাঁর শিল্পীসত্তাকে আক্রমণ করা বা তাঁকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা কোনো সুস্থ সমাজের কাজ নয়। অসীম সরকার এমন এক প্রতিভা, যাঁকে রক্ষা করা মানে একটি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা।
আমরা যদি আজ অসীম সরকারের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিই, তবে আমরা আসলে বাংলার কয়েকশ বছরের পুরোনো কবিগান ঐতিহ্যকেই কবর দেব। প্রতিভা কখনও ক্লাসরুমে আটকে থাকে না, এটি সূর্যের আলোর মতো—যা মেঘের আড়াল থেকে একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসে।
উপসংহার: সভ্যতার বাতিঘর অসীম সরকার
পরিশেষে বলা যায়, কবিয়াল অসীম সরকার কেবল নদীয়ার অসীম নন, তিনি সারা বিশ্বের বাঙালির সম্পদ। তাঁর প্রথাগত শিক্ষার অভাবকে যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁকে খাটো করতে চান, তারা আসলে নিজেরাই জ্ঞানের সংকীর্ণতায় ভুগছেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য লাইব্রেরি লাগে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য লাগে অসীম সরকারের মতো এক বিশাল হৃদয় এবং সাধনা।
অসীম সরকার আমাদের শিখিয়েছেন যে, মাটির কাছাকাছি থেকেও আকাশের দিকে হাত বাড়ানো যায়। তিনি আমাদের লোকসংস্কৃতির সেই জীবন্ত উত্তরাধিকার, যাকে অবহেলা করা মানে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।
