সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন বন্ধ ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে প্রবাসী হিন্দুদের ঐতিহাসিক সমাবেশ

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে প্রবাসী হিন্দুদের এক ঐতিহাসিক ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন বন্ধ ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে প্রবাসী হিন্দুদের ঐতিহাসিক সমাবেশ

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন, মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল ও আইনগত হয়রানির বিরুদ্ধে এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে নিউইয়র্কে প্রবাসী হিন্দুদের এক ব্যতিক্রমী ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী নিউইয়র্ক সিটি মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের লড়াইয়ের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। এই শহরেই কয়েক দশক আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, বর্ণবৈষম্যবিরোধী মিছিল আর অভিবাসী অধিকার রক্ষার সংগ্রাম বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তুলেছিল। সেই শহর এবার সাক্ষী থাকল দক্ষিণ এশিয়ার সংখ্যালঘু হিন্দুদের ন্যায্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে এক আত্মিক, আবেগঘন এবং সুসংগঠিত প্রবাসী সমাবেশের।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে নিউইয়র্ক সিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্পেস হঠাৎ করেই রূপ নেয় রঙিন ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, পতাকা, শঙ্খধ্বনি ও স্লোগানের এক শান্তিপূর্ণ মঞ্চে। বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় হিন্দুরা একত্রিত হয়ে এক সুরে বলতে থাকেন—“Stop Hindu Persecution”, “Save Bangladeshi Hindus”, “Free Chinmoy Krishna Das” এবং “Human Rights for Minorities।” অনেকের হাতে ছিল “Justice for Victims”, “We Stand for Religious Freedom” ও “End Impunity” লেখা প্ল্যাকার্ড, যা ঘটনাটিকে শুধু একটি দেশীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি বৈশ্বিক মানবাধিকার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে।

পুরো সমাবেশ জুড়ে এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ আবেগ কাজ করছিল—একদিকে নিজের মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে নির্যাতিত মানুষের জন্য তীব্র উদ্বেগ ও দায়িত্ববোধ। কেউ কেউ কপালে তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে প্রার্থনার মালা ও গেরুয়া ওড়না নিয়ে উপস্থিত ছিলেন; কেউ আবার সাধারণ পোশাকে, হাতে শুধু একটি প্ল্যাকার্ড—কিন্তু প্রত্যেকের কণ্ঠেই ছিল একই সুর: “সংখ্যালঘু মানে দুর্বল নয়; সংখ্যালঘুর অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”

সমাবেশের পটভূমি: বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, প্রতিমা ভাঙা, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, জমি দখল এবং আইনি হয়রানির অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, গুজব, বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো একটি হিন্দু গ্রাম, পাড়া কিংবা মন্দিরকে টার্গেট করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নারীদের ওপর নির্যাতন, শিশুদের ভয়াবহ মানসিক আঘাত এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাহীনতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মানবাধিকার সংগঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা কমিটি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক পর্যবেক্ষক মহল বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে—এই ধরনের পদ্ধতিগত ও পুনরাবৃত্ত হামলা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য ও দণ্ডহীনতার সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। যখন একটি মন্দিরে হামলার পর আসামিরা দ্রুত গ্রেপ্তার হয় না, বা মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে, তখন একটি বার্তা চলে যায় যে, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করলে এর প্রকৃত শাস্তি পাওয়া খুব সহজ বিষয় নয়। এর ফলে ভুক্তভোগীদের হৃদয়ে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়, আর অপরাধীদের মধ্যে জন্ম নেয় অদৃশ্য উৎসাহ।

বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে—সব নাগরিক সমান, ধর্ম নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার ও মর্যাদা থাকবে। বাস্তবে তবে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো শিক্ষা, চাকরি, নিরাপত্তা, ভূমি রক্ষায় এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাঁধার সম্মুখীন হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা যখন থানায় অভিযোগ জানাতে যান, তখন ‘মামলা না নেওয়া’, ‘চাপ সৃষ্টি করা’ বা ‘বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার পরামর্শ’—এসবের মুখোমুখি হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এক হয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে নীরব রাখতে চায়।

শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা—প্রায় সব দেশেই সংখ্যালঘু হিসেবে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জের নাম। কোথাও আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল; কোথাও আবার রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় কার্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। নিউইয়র্কের এই সমাবেশে তাই বাংলাদেশি হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয়, নেপালি এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীরাও নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যাতে বোঝা যায়—সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নটি মূলত একটি আঞ্চলিক সংকট, যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দেয়।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু: একজন বন্দী, না কি মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীক?

নিউইয়র্কের সমাবেশের কেন্দ্রীয় দাবিগুলোর একটি ছিল—চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি। সমাবেশে বক্তারা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী এবং সংখ্যালঘু হিন্দু অধিকার রক্ষার সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে উদ্বুদ্ধমূলক বক্তব্য, ধর্মীয় আলোচনা এবং নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন। এর ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিরূপ চক্রের চোখেও তিনি ধীরে ধীরে ‘উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি’ হয়ে উঠেছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে, তা নিয়ে দুই ধরনের মত রয়েছে। এক পক্ষের দাবি, তিনি নাকি কিছু বক্তব্যে রাষ্ট্রের প্রতীক, জাতীয় পতাকা বা সংবিধানকে অসম্মান করেছেন; অন্য পক্ষের বক্তব্য, এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ, যার মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের পক্ষে কথা বলাকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রবাসী হিন্দুদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত; তাই এসব ইস্যুকে সহজেই রাষ্ট্রদ্রোহ বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করানো উচিত নয়।

সমাবেশের এক বক্তা বলেন, “চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু কোনো সন্ত্রাসী, চোর বা খুনি নন; তিনি একজন ধর্মীয় শিক্ষক, সমাজের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ। তাঁকে যদি বছরের পর বছর ধরে মামলার জালে আটকে রাখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আর কেউ সংখ্যালঘুদের পক্ষে মুখ খুলতে সাহস পাবে না।” আরেকজন যোগ করেন, “আমরা আদালতের বিচারকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু একই সঙ্গে চাই—বিচার প্রক্রিয়া যেন হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত। রাজনৈতিক চাপ বা ধর্মীয় পক্ষপাত যেন কোনোভাবেই বিচারকে প্রভাবিত করতে না পারে।”

সমাবেশে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, কেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত এত দীর্ঘসময় ধরে ঝুলে আছে, অথচ তাঁর জামিন বা মানবিক বিবেচনায় মুক্তির বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, তাঁর পরিবার, অনুসারী এবং পুরো সংখ্যালঘু সমাজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। এর ফলে একটি ধারণা জন্ম নেয় যে, সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই তাদের কণ্ঠস্বর, অভিযোগ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে।

নিউইয়র্ক সমাবেশের দৃশ্য: স্লোগান, প্রার্থনা আর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ

সমাবেশের শুরুতে একটি ছোট্ট প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকজন কীর্তন ও ভজন গেয়ে শোনান; কেউ কেউ গীতা, উপনিষদ ও ভক্তিমূলক গ্রন্থ থেকে শান্তি, ন্যায় ও সহমর্মিতা সম্পর্কিত শ্লোক পাঠ করেন। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে তারা জানান—তাদের আন্দোলন কোনো ঘৃণা, প্রতিশোধ বা সহিংসতার জন্য নয়; বরং শান্তিপূর্ণভাবে ন্যায়বিচারের দাবিতে দাঁড়ানোর একটি প্রয়াস। এর পরপরই শুরু হয় মূল বক্তব্য ও স্লোগানের পর্ব।

“Stop Hindu Persecution”, “Justice for Bangladeshi Hindus”, “We Demand Human Rights”, “Free Chinmoy Krishna Das”—মুহূর্তে এ সব স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ কেউ বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে একসঙ্গে স্লোগান দেন, যাতে পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকা বিভিন্ন দেশের মানুষও বিষয়টি সহজে বুঝতে পারেন। অনেকেই তাদের হাতে থাকা পোস্টারে বাংলাদেশের মানচিত্র এঁকে তাতে মন্দির, বাসাবাড়ি ও ধূপধুনোর প্রতীক আঁকেন, যেন বিশ্বকে জানানো যায়—এই মাটিতে একসময় সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে ছিল, আজও সেই স্বপ্ন তারা বাঁচিয়ে রাখতে চান।

সমাবেশে অংশ নেওয়া এক প্রবাসী বাংলাদেশি হিন্দু তরুণ বলেন, “আমরা হয়তো দূরে আছি, কিন্তু গ্রামের বাড়ির মন্দিরের ঘণ্টা, দুর্গাপূজার ঢাক আর কালীপূজার আলোর মেলা এখনও চোখের সামনে ভাসে। যখন দেখি সেই মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙা আর পূজারীকে মারধর করা হয়, তখন মনে হয়—আমরা চুপ থাকলে, আমাদের জন্য কেউই কথা বলবে না।” তার কণ্ঠের কম্পন, চোখের জল আর মাইক্রোফোনের সামনে তার অনিশ্চয়তা পুরো সমাবেশকেই আবেগে ভাসিয়ে দেয়।

আরেকজন বক্তা, যিনি নিউইয়র্কে বসবাসরত এক নারী পেশাজীবী, বলেন, “আমি এই দেশে এসেছি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের স্বপ্ন নিয়ে। এখানে আমি নিরাপদ, আমার সন্তানরা নিরাপদ। কিন্তু আমার গ্রামের বাড়িতে যদি আমার বিধবা খালা বা দিদার বাড়িতে হামলা হয়, জমি দখল হয়, মন্দির ভাঙা হয়—তাহলে আমি কীভাবে চোখ বন্ধ করে থাকি? এই সমাবেশ আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছে এক ধরনের জবাবদিহি।”

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আইন ও নৈতিকতার আলোচনায় সমাবেশ

শুধু আবেগ নয়, সমাবেশে ছিল সুসংগঠিত বিশ্লেষণও। কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জাতিসংঘ সনদ, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রস্তাবনার আলোকে বক্তব্য দেন। তারা মনে করিয়ে দেন, যে কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দায় নয়, বরং নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাও গ্রহণ করে।

বক্তারা বলেন, একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের নিরাপত্তা দিয়ে বিচার করলে হবে না; সবচেয়ে দুর্বল, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে—সেটাই প্রকৃত মানবাধিকার মানদণ্ড। যখন কোনো সংখ্যালঘু পরিবার ভয় পায় থানায় যেতে, যখন মন্দিরে হামলার ঘটনার পরেও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, তখন স্পষ্ট হয়—আইনের শাসন ও মানবাধিকারের বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

তারা জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার উদ্দেশে আহ্বান জানান, যেন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আরও ঘন ঘন ফ্যাক্ট–ফাইন্ডিং মিশন, রিপোর্ট এবং কূটনৈতিক আলোচনার আয়োজন করা হয়। বক্তাদের ভাষায়, “শুধু বিবৃতি দিয়ে, টুইটে নিন্দা জানিয়ে থেমে গেলে হবে না; সংখ্যালঘুদের সুরক্ষাকে উন্নয়ন সহযোগিতা, কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরতে হবে।”

একই সঙ্গে তারা এও মনে করিয়ে দেন যে, প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল বাস্তবতা রয়েছে; তাই আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে হলেও সেটি যেন হয় গঠনমূলক, সহায়ক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কোনো দেশকে কোণঠাসা করে, জনগণকে শত্রু ভেবে নয়; বরং সংলাপ, সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া: হ্যাশট্যাগ থেকে বাস্তব সংহতি

সমাবেশ শেষ না হতেই নিউইয়র্কের সেই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। #SaveBangladeshiHindus, #ChinmoyKrishnaDas, #StopHinduPersecution, #HumanRightsForMinorities—এমন হ্যাশট্যাগে হাজারো পোস্ট, ছবি ও ভিডিও ভেসে যেতে থাকে। প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কর্মজীবী, গৃহিণী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মীও এসব পোস্ট শেয়ার করে সংহতি জানান।

অনেকেই লিখেন, “আমরা চুপ থাকলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না”, “নির্যাতিত মানুষের ধর্ম নয়, মানুষটাকে দেখুন”, “হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবাই যদি নিরাপদ না থাকে, তবে কোনো দেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না।” কেউ কেউ আবার তাদের শৈশবের স্মৃতি শেয়ার করেন—গ্রামে একসঙ্গে ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমা পালন করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সেই সহাবস্থানের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে নিউইয়র্কের সমাবেশকে নিয়ে ব্যাখ্যামূলক পোস্টও দেখা যায়। সেখানে তুলে ধরা হয়, কীভাবে ধারাবাহিক সহিংসতা, ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে বহু হিন্দু পরিবার ধীরে ধীরে নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে; কেউ আবার শহরে, কেউ অন্য প্রদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। এই ‘নীরব প্রস্থান’ বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন, যা শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বহুত্ববাদী চরিত্রকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

সমাবেশে উপস্থিত এবং অনুপস্থিত অনেকেই অনলাইনে প্রস্তাব করেন, যাতে নিয়মিতভাবে ওয়েবিনার, অনলাইন কনফারেন্স ও ভার্চুয়াল টাউন–হল মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। এতে করে যারা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন না, তারাও অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ শেয়ার করতে পারবেন; পাশাপাশি এই ইস্যুকে মূলধারার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে আরও বেশি করে তুলে ধরা যাবে।

ভবিষ্যৎ কর্মসূচি: নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন, লন্ডন, ইউরোপের পথে

সমাবেশের শেষ দিকে আয়োজকরা ঘোষণা করেন, নিউইয়র্কের এই কর্মসূচি কোনো একদিনের আবেগ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। তারা জানান, প্রয়োজনে ওয়াশিংটন ডিসি, লন্ডন, ব্রাসেলস, জেনেভা, টরন্টো, সিডনি এবং ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরেও ধারাবাহিক মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও সেমিনারের আয়োজন করা হবে। লক্ষ্য একটাই—বিশ্বের নীতিনির্ধারক মহলের নজরে আনতে হবে যে, একটি দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতন শুধু সেই দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধেরও বড় হুমকি।

তারা পরিকল্পনা করেন, বিভিন্ন দেশের এমপি, সিনেটর, মানবাধিকারবিষয়ক কমিটি, ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের কাছে লিখিত স্মারকলিপি পাঠানো হবে, যেখানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সংখ্যালঘুদের বর্তমান পরিস্থিতি, পরিসংখ্যান, ঘটনাবলি ও সুপারিশগুলো প্রমাণসহ তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মতামতধর্মী লেখা, ডকুমেন্টারি এবং সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বাস্তব চিত্র পৌঁছে দেওয়ারও কথা বলেন তারা।

এ ছাড়া প্রবাসীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকেও ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার পরামর্শ আসে। প্রস্তাব করা হয়, যারা প্রবাসে বসে আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা যেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, আইনি সহায়তা সংস্থা, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলিতভাবে নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর জন্য ফান্ড তৈরি করতে পারেন। এই তহবিল ব্যবহার করে আইনি লড়াই, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষাবৃত্তি এবং মানসিক সহায়তা—সবক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আয়োজকেরা এক কণ্ঠে বলেন, “আমাদের আন্দোলন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে।” তারা বারবার মনে করিয়ে দেন, যে কোনো ধরনের ঘৃণা, প্রতিশোধমূলক বক্তব্য বা সহিংসতাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা—একটি এমন দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, বিহার ও গুরদুয়ারা—সব ধর্মীয় স্থানের জন্য সমান নিরাপত্তা, সমান সম্মান এবং আইনগত সুরক্ষা থাকবে।

সমাপনী ভাবনা: প্রবাসে থেকেও মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা

নিউইয়র্কের এই সমাবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠিয়ে পরিবারের পাশে থাকেন না; তারা মানসিক, সামাজিক ও নৈতিকভাবেও নিজেদের মাতৃভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখেন। তাদের শৈশবের গ্রাম, পাড়ার মন্দির, স্কুলের মাঠ, বারোয়ারি পূজার প্যান্ডেল—এসব স্মৃতি আজও তাদের হৃদয়ে জীবন্ত। যখন সেই মন্দিরে আগুন লাগে, সেই পাড়ায় থাকা হিন্দু পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়, তখন নিউইয়র্কের উঁচু ভবনের মাঝেও তাদের বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

সমাবেশে যেমন ছিল কান্না, তেমন ছিল দৃঢ়তা। প্রবীণ এক অংশগ্রহণকারী বলেন, “আমরা হয়তো আর বাংলাদেশে ফিরব না; কিন্তু আমাদের নাতি–নাতনিরা যেন অন্তত বইতে পড়ে, বাংলাদেশ একদিন সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ দেশ হয়ে উঠেছিল।” এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে একদিকে কষ্ট, অন্যদিকে স্বপ্ন। স্বপ্ন—একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং বহুত্ববাদী সমাজের, যেখানে সংখ্যালঘু হওয়া মানে আর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা নয়; বরং সম্মান, নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে হাঁটা।

নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক এই সমাবেশ তাই কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি ভবিষ্যতের দিকে ছুড়ে দেওয়া এক ধরনের নৈতিক চ্যালেঞ্জ—রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে। প্রশ্নটি খুব পরিষ্কার: “আমরা কি এমন একটি বিশ্ব গড়তে চাই, যেখানে মানুষের ধর্ম, ভাষা, জাতিগত পরিচয় নয়; তার মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারই হবে প্রধান?” উত্তরটি নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর।

প্রবাসী হিন্দু সমাজ দেখিয়ে দিয়েছে—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, হৃদয়ের দূরত্ব তারা মেনে নেয় না। তারা বিশ্বাস করে, একদিন না একদিন, তাদের কণ্ঠস্বর, প্রার্থনা ও প্রতিবাদ মিলেই পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে। আর সেদিন হয়তো ইতিহাস লিখবে—নিউইয়র্কের এই এক বিকেলের সমাবেশও ছিল সেই দীর্ঘ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

✍️ লেখক: রঞ্জিত বর্মন📍 নিউইয়র্ক – ঢাকা

এই প্রতিবেদনটি একটি শান্তিপূর্ণ প্রবাসী সমাবেশের বর্ণনা, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা ও চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুসহ সকল ধর্মীয় অধিকারকর্মীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment