ধর্ম-পিতার অশ্রুসিক্ত আশীর্বাদে নতুন জীবন: অনাথ ও দরিদ্র কন্যাদের বিয়ে দিয়ে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত গড়লেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী
লেখক: RANJIT BARMON
সম্পাদনা ও পুনর্গঠন: অনলাইন ডেস্ক
ভারতীয় সমাজে “বিয়ে” শুধু একটি সামাজিক আয়োজন নয়, এটি সম্মান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের এক পবিত্র প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বাস্তবের প্রান্তিক প্রেক্ষাপটে এমন অসংখ্য কন্যা আছে, যাদের কাছে বিয়ে ছিল এক অদেখা, অপ্রাপ্য স্বপ্ন—অনাথ আশ্রমের ঘর, দিদার ছোট্ট কুঁড়েঘর কিংবা অন্ধকার ঝুপড়ি বস্তিই ছিল যাদের একমাত্র আশ্রয়।
কেউ পিতৃহারা, কেউ মাতৃহারা, কেউ আবার ছোটবেলায় দুর্ঘটনায় বাবাকে হারিয়েছে, কেউ কোনোদিন মায়ের স্নেহের ছায়া দেখেনি; কেউ দিদার কোলে বড় হয়েছে, কেউ অভাবের সংসারে প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকতে শিখেছে। তাদের প্রতিদিনের একটাই অদৃশ্য প্রশ্ন—“এই মেয়ের হাত ধরবে কে?”
বাগেশ্বর ধামে আবেগঘন এক দিন
মহা শিবরাত্রির পবিত্র তিথিতে বাগেশ্বর ধামে এক অনন্য সম্মিলিত বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ধর্মগুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী নিজে শত শত দরিদ্র ও অসহায় কন্যার বিয়ের দায়িত্ব নেন। এই উদ্যোগ শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, মানবিকতার আকারেও এক বিরল উদাহরণ হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে বাগেশ্বর ধামে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র কন্যাদের বিয়ের মতো মানবিক কার্যক্রমও নিয়মিত আয়োজিত হয়ে আসছে, যা ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর সামাজিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ দিনের আয়োজনটি তাই ছিল বহু প্রতীক্ষিত—গ্রামবাংলার প্রান্তিক অঞ্চল থেকে, আশ্রম থেকে, আত্মীয়হীন কোণে বেড়ে ওঠা অসংখ্য কন্যা একত্রিত হয়েছিল এক নতুন জীবনের আশায়, এক নতুন পরিচয়ের প্রত্যাশায়।
“আজ থেকে এরা আর অনাথ নয়… আমি আছি”
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয়, যখন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী সকল কন্যার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, “আজ থেকে এরা আর অনাথ নয়… আমি আছি।” কয়েকটি শব্দ, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল হাজারো কান্না-চেপে-রাখা জীবনের অশ্রু মুছে দেওয়ার এক গভীর প্রতিশ্রুতি।
অনেক মেয়ের চোখে সেই মুহূর্তে জল চলে আসে; কেউ মাথা নত করে কেঁদে ফেলে, কেউ আবার কাঁপা হাতে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নেয়। অনেকের জীবনে প্রথমবারের মতো কেউ প্রকাশ্যে তাদের “আপন” বলে দাবি করেছেন, কেউ বলেছে—“তুমি একা নও, তোমার পাশে আমি আছি।”
এই একটি ঘোষণা যেন তাদের আইডেন্টিটি বদলে দিল—“অনাথ” থেকে “অধিকারপ্রাপ্ত কন্যা”, পরিত্যক্ত থেকে সম্মানিত। সমাজের চোখে আজ থেকে তারা আর করুণা নয়, সম্মান পাওয়ার যোগ্য নাগরিক।
সাজ সজ্জা, আয়োজন, আর সম্মানের বিয়ে
সম্মিলিত বিবাহের এই আয়োজন ছিল সম্পূর্ণ মর্যাদাপূর্ণ ও সুসংগঠিত। কন্যাদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল নতুন পোশাক, শাড়ি, লেহেঙ্গা ও মানানসই অলংকার, যাতে তাদের জীবনের এই বিশেষ দিনটি কোনো দিক থেকেই অপূর্ণ না থেকে যায়।
প্রতিটি কন্যার জন্য গহনা, প্রসাধনী, এবং বিয়ের দিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়াও গৃহস্থালির প্রাথমিক উপহার—বাসনপত্র, বিছানা, রান্নার হাড়ি-পাতিল, সামান্য আসবাবপত্র—দেওয়া হয়, যেন নতুন সংসার শুরু করার সময় তারা কিছুটা হলেও নির্ভার থাকতে পারে।
বিয়ের সম্পূর্ণ আচার অনুষ্ঠান, কন্যা সম্প্রদান থেকে হোম, সিঁদুরদান, সাতফেরা বা সপ্তপদী—সবই সম্পন্ন হয় বৈদিক নিয়ম, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক প্রথার সম্পূর্ণ মর্যাদা রেখে।
হিন্দু বিবাহ: দায়িত্ব, ধর্ম ও সহযাত্রা
হিন্দু ধারনায় বিবাহকে শুধু পুরুষ ও নারীর সহবাসের অনুমোদন হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে এক পবিত্র সংসার ধর্ম, যজ্ঞ, দায়িত্ব ও সহযাত্রার বন্ধন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বৈদিক মতানুসারে এটি অস্থি ও মজ্জার মতই গভীর এক মিলন—শরীর, মন ও ধর্মাচরণের একাত্মতা।
হিন্দু বিবাহের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে কন্যা সম্প্রদান, প্রার্থনা, হোম, অগ্নিসাক্ষী এবং সপ্তপদী—যেখানে দম্পতি সাত পদ অগ্রসর হয়ে সাতটি প্রতিশ্রুতি নেন—ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, পারস্পরিক সহায়তা, সন্তানের প্রতিপালন ও আজীবনের সহযাত্রার শপথ।
এই প্রেক্ষাপটে, ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর আয়োজন করা সম্মিলিত বিবাহগুলোও শুধু আনুষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার জন্য নয়, বরং এই সাতটি প্রতিশ্রুতির সামাজিক বাস্তবতা নিশ্চিত করার এক প্রচেষ্টা—যাতে দরিদ্র বা অনাথ হওয়া কোনো কন্যার অধিকারকে কমিয়ে না দেয়।
সম্মিলিত বিবাহ: দারিদ্র্য আর সামাজিক কলঙ্কের বিরুদ্ধে অস্ত্র
ভারতীয় সমাজে দরিদ্র পরিবারের জন্য বিয়ের খরচ প্রায়ই এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়—পণ, ভোগ্যসামগ্রী, বিবাহ মণ্ডপ, অতিথি আপ্যায়ন, সামাজিক মান রক্ষার চাপ সব মিলিয়ে অনেক বাবা-মায়ের কাছে কন্যা-বিবাহ এক ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্মিলিত বিবাহ সেই চাপকে এক আঘাতে ভেঙে দেয়। একই স্থানে, নিয়মতান্ত্রিক ও সংগঠিতভাবে একাধিক কন্যার বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনা যায়, একই সঙ্গে কন্যাদের আত্মসম্মানও অক্ষুণ্ণ থাকে—তারা কাউকে হাত পাততে বাধ্য হয় না, দান হিসেবে নয়, অধিকারের হিসেবে তারা বিবাহের মর্যাদা পায়।
ধর্মীয় নেতারা যখন নিজের ধাম বা আশ্রম থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেন, তখন সেটা কেবল এক দিনের অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অন্য অনেক সংগঠন, এনজিও, ব্যক্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে একই পথে হাঁটার অনুপ্রেরণা দেয়।
অশ্রু, সিঁদুর আর নবজন্মের অনুভূতি
অনুষ্ঠানের দিনটি ছিল আবেগের ঘনঘটা। যখন দরিদ্র কন্যাদের মাথায় সিঁদুর উঠল, গলায় মঙ্গলসূত্র পরিয়ে দিলেন তাদের স্বামী, তখন মণ্ডপজুড়ে ফিসফিস করে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দ আর কান্নার মিশ্র এক স্রোত।
যাদের জীবনে “বিয়ে” ছিল শুধু গল্পের বইতে পড়া শব্দ, সিনেমার দৃশ্যে দেখা কল্পনাময় অনুষ্ঠান, তাদের জীবনের বাস্তব ক্যানভাসে সেদিন সত্যিই আঁকা হলো এক নতুন জীবনের ছবি। কোনো কন্যা চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি; চোখ ভিজেছে আত্মীয়স্বজনের, উপস্থিত দর্শনার্থীদেরও।
অনেকের অনুভূতি ছিল—আজ যেন ঈশ্বর নিজেই আশীর্বাদের আলো হাতে নিয়ে নেমে এসেছেন, ঘড়ির কাঁটা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে দিচ্ছেন এতদিনের অভিমান আর অপমানের ইতিহাস। ধর্মীয় আচার, বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ আর মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ মিলেমিশে যেন এক নতুন আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছিল।
কন্যা বোঝা নয়, কন্যা দায়িত্ব
সমাজের অনেক স্তরে এখনও কন্যা সন্তানকে বোঝা হিসেবে দেখা হয়—বিয়ের খরচ, পণ, এবং “মেয়েকে একদিন না একদিন বিদায় দিতে হবে”—এই মানসিকতা থেকে অনেক পরিবার কন্যা জন্মেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বাগেশ্বর ধামের এই সম্মিলিত বিবাহ যেন এক নীরব চ্যালেঞ্জ—“কন্যা বোঝা নয়, কন্যা দায়িত্ব; অনাথ মানে একা নয়, অনাথ মানে আরও বেশি আপন।” কন্যাদের সম্মানের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া, তাদের পাশে সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া—এসবই কন্যা-ভিত্তিক বৈষম্য ও মানসিকতার বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা।
ধর্মীয় মঞ্চ থেকে যখন মানবিকতার এ ধরনের বার্তা যায়, তখন তা শুধু উপদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না; বাস্তবে পরিবর্তন আনতে শুরু করে—গ্রামে, শহরে, পরিবারে, অভিভাবকের মননেও আলোড়ন তোলে।
ধর্ম মানে আচার নয়, দায়িত্ব ও মানবসেবা
অনেক সময় ধর্মকে আমরা শুধু আচার, অনুষ্ঠান, ব্রত, উপবাস, পূজা বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু নানা যুগে নানা আচার্য, সাধক ও ধর্মীয় নেতারা দেখিয়েছেন—ধর্মের আসল শক্তি মানুষের দুঃখঘুচানো, ভাঙা জীবনকে জোড়া লাগানো, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।
ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর বাগেশ্বর ধামে অন্নপূর্ণা রান্নাঘর থেকে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, দরিদ্র ও দুঃস্থ মেয়েদের বিবাহের মতো সামাজিক উদ্যোগ—এসবই দেখায় যে ধর্মচর্চা মানে শুধু মন্ত্র নয়, মমতাও; শুধু যজ্ঞ নয়, মানবসেবাও।
এই দৃষ্টান্ত আমাদের শেখায়—যে ধর্ম মানুষের চোখের জল মুছে দেয়, সেটাই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত ধর্ম; যে ধর্ম ক্ষুধার্তের পেট ভরাতে পারে না, ভাঙা জীবনে আশার আলো জ্বালাতে পারে না, সে ধর্ম আচার মাত্র।
ভারতীয় সমাজে বিবাহপ্রথা ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ভারতে এখনও বেশির ভাগ বিয়ে পরিবার-নির্ধারিত, একই ধর্ম, একই জাত ও প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ; ভিন্নধর্মী বা আন্তঃসম্প্রদায় বিবাহের সংখ্যা মোট বিবাহের একটি ছোট অংশ মাত্র। সামাজিক চাপ, ধর্মীয় পূর্বধারণা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে পরিবর্তনের পথে এগোতে বাধা দেয়।
তবু, একদিকে আইনি স্বীকৃতি, অন্যদিকে অনাথ ও দরিদ্র কন্যাদের সম্মিলিত বিবাহের মতো উদ্যোগগুলো এক নতুন সামাজিক বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়—যেখানে মানুষের অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা মুখ্য, আর জন্মপরিস্থিতি গৌণ।
এইসব উদ্যোগ দেখায়, ধর্মীয় পরিচয়, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর ওপরে উঠে “মানুষ” নামের পরিচয়কে সামনে আনা সম্ভব, যদি নেতৃত্ব সত্যিকার অর্থে মানবিকতা ও সহমর্মিতাকে অগ্রাধিকার দেয়।
অনাথ আশ্রম থেকে শ্বশুরবাড়ি: এক মেয়ের যাত্রা
ভাবুন, একটি মেয়ের কথা—ছোটবেলাতেই বাবা-মা দু’জনকে হারিয়েছে, কোনো আত্মীয় তাকে দায়িত্ব নিয়ে নিজের কাছে নিতে পারেনি। আশ্রমের ঘর, বারান্দা, ডাইনিং হল, ছোট্ট প্রাঙ্গণ আর কয়েকজন “দিদি”ই তার পৃথিবী। শৈশব মানেই সেখানে নিয়ম, গেট, সীমানা আর প্রয়োজনের সীমাবদ্ধতা।
সেই মেয়েটি হয়তো বহুবার অন্যদের বিয়ের ছবি দেখেছে, আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে বা টিভি স্ক্রিনে দেখে মুগ্ধ হয়েছে, ভেবেছে—“আমার কি কখনও এমন হবে?” কিন্তু নিজের জীবনের প্রশ্নে সে কখনও উত্তর পায়নি।
ধর্ম-পিতার আশীর্বাদে যখন তার মাথায় সিঁদুর উঠল, তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বামী সাতটি পদ এগিয়ে গেল, সমাজ স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়াল, তখন সেই অনাথ আশ্রমের মেয়ে এক লহমায় বদলে গেল “বউ” পরিচয়ে। আশ্রমের বিছানা ছেড়ে এখন তার নতুন গৃহ, নতুন পরিবার, নতুন দায়িত্ব—এ যেন তার জীবনের দ্বিতীয় জন্ম।
সমালোচনা, বিতর্ক ও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন
ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে সমাজে সবসময়ই দ্বিমত থাকে; কেউ বলেন, এগুলো নিছক জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম, কেউ বলেন, এসব দিয়ে কাঠামোগত দারিদ্র্য দূর হয় না। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন—বিয়ের আগে কন্যাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর নাম ঘিরেও নানা সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান, সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব ও বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবু, যে দিন শত শত অনাথ ও দরিদ্র কন্যার বিয়ে সম্পন্ন হলো, সেদিনের অশ্রুসিক্ত হাসি, কৃতজ্ঞতা আর আশার আলোকে কেবল “রাজনীতি” বা “প্রচার” দিয়ে মাপা যায় না।
সমালোচনা ও প্রশ্ন অবশ্যই থাকবে, থাকা উচিতও; কারণ তা প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বচ্ছ হতে সাহায্য করে। তবে অস্বীকার করা যায় না, যে বাড়তি নিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান এই কন্যারা পেয়েছে, তা তাদের আগের বাস্তবতার তুলনায় নিঃসন্দেহে অগ্রগতি।
মানবতার আলো যেন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র
বাগেশ্বর ধামে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত বিবাহের এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবতার কাজ কখনও একা কোনো ব্যক্তির, গোষ্ঠীর বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি সার্বজনীন চেতনা।
আজ যদি একটি আশ্রম, একটি মন্দির, একটি ধর্মীয় সংস্থা অনাথদের পাশে দাঁড়ায়, আগামীকাল হয়তো অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় একইভাবে দরিদ্র, অসহায় ও অনাথ মানুষের জীবন বদলাতে এগিয়ে আসবে।
এই পৃথিবী তখন সত্যিই এক অন্যরকম জায়গা হয়ে উঠবে, যেখানে “অনাথ” শব্দটি শুধুই কাগজে লেখা আইনি শব্দ, বাস্তব জীবনে নয়; যেখানে প্রতিটি কন্যা, প্রতিটি শিশু, প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিরাপদ, আপনজনের মাঝে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারার অধিকারী মনে করবে।
শেষ কথায়
আজকের বিভক্ত, বিতর্কিত ও অস্থির সময়ে যখন খবরের শিরোনাম প্রায়ই ঘৃণা, সহিংসতা ও বিভাজনের গল্প বলে, তখন বাগেশ্বর ধামের মতো একটি সম্মিলিত বিবাহের দৃশ্য অন্য এক গল্প শোনায়—মানুষের ভেতরে ঈশ্বর এখনো বেঁচে আছেন।
একজন ধর্ম-পিতা যখন শত শত কন্যার চোখের জল মুছে দেন, তাদের মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখেন, সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন—“আজ থেকে এরা আর অনাথ নয়… আমি আছি”—তখন বোঝা যায়, ধর্ম কেবল মন্দিরের গর্ভগৃহে নয়, মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই সত্যিকারভাবে বাস করে।
এই আলো যেন নিভে না যায়, এই মানবিকতার গল্প যেন আরও অনেক প্রান্তিক মেয়ের জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে—এই প্রার্থনাই করি।
