✍️ লেখক: রঞ্জিত বর্মন
ভূমিকা: এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় যখন ধর্মীয় মেরুকরণ, সহিংসতা ও মতাদর্শগত সংঘাতের খবর প্রতিদিন শিরোনাম হয়, ঠিক তখনই আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মঞ্চে সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিত্বে ইসকন-এর এক সন্ন্যাসীর অংশগ্রহণ এক অনন্য এবং অর্থবহ ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। এই উপস্থিতি কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং সনাতন ধর্মের চিরন্তন মানবিক বার্তা—সত্য, করুণা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা ও আত্মসংযমকে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে “বসুধৈব কুটুম্বকম্”—সমগ্র পৃথিবী এক পরিবার—এই মহান দর্শন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যা প্রাচীন ভারতীয় মুনি–ঋষিদের ভাবনার সারসংকলন। ইসকন সন্ন্যাসীর বক্তব্যে উঠে আসা এই মন্ত্র শুধু একটি শ্লোক নয়, বরং ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্রান্তি–ধ্বনি।
আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি: পরিচয়, দর্শন ও ভূমিকা
ইরানের পবিত্র শহর কুম-ভিত্তিক আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, যা মূলত বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের জন্য শিয়া ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, ফিকহ, কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি হাওযা ভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক মানবিক বিদ্যার সমন্বয়ে একটি বৃহৎ একাডেমিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বের বহু দেশ থেকে শিক্ষার্থী আকর্ষণ করে, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা একত্রে বসবাস ও অধ্যয়ন করে থাকে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী ও স্নাতক রয়েছে, যারা বহু জাতীয়তা থেকে এসেছে। তাদের জন্য নানা বিষয়ের উপর পাঠদান হয়, যা শুধুমাত্র ধর্মীয় বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক বিজ্ঞান, ভাষা ও আন্তঃধর্মীয় আলোচনাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
মূলত শিয়া মতবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুন্নি ও অ–মুসলিম শিক্ষার্থী ও অতিথিদের জন্যও বিভিন্ন ধরনের একাডেমিক ও সংলাপমুখী প্রোগ্রাম থাকে, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয় এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের একটি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে সনাতন ধর্মের একজন সন্ন্যাসীর উপস্থিতি আন্তঃধর্মীয় বোঝাপড়া ও পারস্পরিক সম্মানের পথে একটি সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইসকন: ভক্তি আন্দোলনের বৈশ্বিক রূপ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিশ্বব্যাপী ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত ও ভক্তি–যোগের শিক্ষা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রভুপাদ প্রতিষ্ঠিত এই আন্দোলন হরিনাম–সংকীর্তন, প্রসাদ বিতরণ, গ্রন্থ প্রচার, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা–কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবদান রেখে চলেছে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইসকন আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে নিজেদের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, বৌদ্ধ ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও আস্থা তৈরি করার কাজ করছে। ইসকন-এর নীতিমালায় সংলাপকে দেখা হয় অন্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিকাশের এবং নিজের ভক্তি–দর্শনকে নম্রভাবে ভাগ করে নেওয়ার একটি সোনালী সুযোগ হিসেবে।
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে ইসকন মন্দিরগুলো স্থানীয় চার্চ, মুসলিম সংগঠন ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সেমিনার, মানবসেবা কার্যক্রম ও শান্তি–সংলাপ আয়োজন করেছে, যা আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ককে সন্দেহ ও দূরত্ব থেকে বের করে এনে আস্থা, সহযোগিতা ও যৌথ মানবিক উদ্যোগের স্তরে নিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ইসকন সন্ন্যাসীদেরকে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সনাতন ধর্মের ভাবধারা তুলে ধরতে প্রস্তুত করেছে।
“বসুধৈব কুটুম্বকম্”: বিশ্বকে এক পরিবার ভাবার সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি
“বসুধৈব কুটুম্বকম্” প্রাচীন ভারতীয় উপনিষদীয় ঐতিহ্যের এক মহামন্ত্র, যার অর্থ—“সমগ্র পৃথিবীই এক পরিবার”। এই মন্ত্র মহা উপনিষদ সহ বিভিন্ন গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে একে মানবিকতা, অন্তর্ভুক্তি, সহিষ্ণুতা ও সার্বজনীন প্রেমের প্রতীক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
শব্দতাত্ত্বিকভাবে “বসুধা” মানে পৃথিবী বা বিশ্ব, “এব” মানে “নিশ্চয়ই” এবং “কুটুম্বকম” মানে পরিবার। অর্থাৎ এই মন্ত্র ঘোষণা করছে যে ভৌগোলিক সীমারেখা, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতি ও সকল জীব–জন্তু একই বিশ্বপরিবারের সদস্য। এই দর্শনের মর্মবাণী হলো—কারো কল্যাণ অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে হতে পারে না; প্রকৃত কল্যাণ সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
আধুনিক সময়ে “বসুধৈব কুটুম্বকম্” ভারতীয় কূটনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও আলোচিত একটি নৈতিক ধারণা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চেও এই মন্ত্রকে বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে যখন আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রে এক ইসকন সন্ন্যাসী এই মন্ত্র উচ্চারণ করেন, তখন তা দুই ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে গভীর মানবিক সেতুবন্ধনের সম্ভাবনা তৈরি করে।
সনাতন ধর্মের সার্বজনীন শিক্ষা: সত্য, অহিংসা, করুণা ও আত্মসংযম
সনাতন ধর্মের মূল শিক্ষা বহুমাত্রিক, তবে কয়েকটি মৌলিক মূল্যবোধ প্রায় সব গ্রন্থেই বারবার উচ্চারিত হয়েছে—সত্য, অহিংসা, দয়া বা করুণা, শৌচ বা পবিত্রতা, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরভক্তি। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ “অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, দয়া…” সহ বহু দैব গুণের কথা বর্ণনা করেছেন, যা যেকোনো সমাজকে শান্তি ও শৃঙ্খলার পথে পরিচালিত করতে পারে।
অহিংসা এখানে শুধু শারীরিক আঘাত না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিন্তা, বাক্য ও আচরণে কাউকে কষ্ট না দেওয়ার এক সমন্বিত নৈতিকতা। করুণা মানে কেবল দান–ধ্যান নয়, বরং অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করার অন্তর্মুখী চেতনা। আত্মসংযম আবার ব্যক্তি–জীবনকে বহির্মুখী ভোগ–বিলাসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে ঈশ্বরকেন্দ্রিক এক শান্ত, স্থিতিশীল ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনের দিকে পরিচালিত করে।
যখন এই মূল্যবোধগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উচ্চারিত হয়, তখন তা কোনো একক ধর্মের সংকীর্ণ প্রচার না হয়ে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণকামী এক নৈতিক ছক হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইসকন-এর ভক্তি–দর্শন ও নাম–সংকীর্তন আন্দোলন এই মূল্যবোধকে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠা করার একটি সহজ ও প্রায়োগিক পথ দেখায়, যা ধর্মীয় পরিচয় ভেদে যে কেউ গ্রহণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংলাপ: প্রয়োজন, প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতিনিধিরা একই শহরে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, একই কর্মক্ষেত্রে একসঙ্গে বসবাস করছে। এই বাস্তবতায় যদি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাশীল সংলাপ না থাকে, তবে ভুল বোঝাবুঝি, ঘৃণা, উগ্রতা ও সংঘাত অজান্তেই বেড়ে ওঠে। তাই আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এখন কেবল একটি আদর্শিক ধারণা নয়, বরং নিরাপদ, স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োজন।
ইসকন গত কয়েক দশকে বিশেষ ভাবে খ্রিস্টান গির্জা, ক্যাথলিক নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনের সাথে নিয়মিত সংলাপ ও যৌথ সম্মেলন করেছে, যেখানে দুই পক্ষই তাদের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ বিনিময় করার সুযোগ পেয়েছে। এসব সংলাপ প্রাথমিক সন্দেহ ও দূরত্ব দূর করে পারস্পরিক সম্মান, শেয়ার করা মানবিক মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক জীবনের গভীর উপলব্ধিকে জাগ্রত করেছে। অর্থাৎ সংলাপ কখনও বিশ্বাসকে দুর্বল করেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা বিশ্বাসকে আরও মজবুত ও সচেতন করেছে।
আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো ইসলামি কেন্দ্রে সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিত্বও একই ধরণের আন্তঃধর্মীয় আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে এর সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে—রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মতাদর্শগত পূর্বধারণা, ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য হারানোর আশঙ্কা ইত্যাদি। এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার একমাত্র পথ হলো—খোলা মন, বিনয়, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান, এবং “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শনকে সামনে রাখা।
আল-মুস্তাফার মঞ্চে ইসকন সন্ন্যাসী: ঘটনার তাৎপর্য
আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মূলত ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্র হলেও, এর আন্তর্জাতিক চরিত্রের কারণে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের উপস্থিতি সেখানে একটি বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে ইসকন-এর এক সন্ন্যাসীর উপস্থিতি ও বক্তব্য একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ততা ও সংলাপ–মুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে, অন্যদিকে সনাতন ধর্মের বহুমাত্রিক চিন্তা–ধারাকেও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার বাস্তব সুযোগ তৈরি করে।
সন্ন্যাসীর বক্তব্যে “বসুধৈব কুটুম্বকম্” মন্ত্রের উল্লেখ, ভগবদ্গীতার সার্বজনীন শিক্ষা এবং ঈশ্বরকে সকল জীবের অন্তর্যামী হিসেবে দেখার দৃষ্টি, ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যের সামনে এক অত্যন্ত মানবিক ও দার্শনিক আলোচনার পরিসর সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ইসলামিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেও আল্লাহ্কে “রবুল আলামীন”—সমস্ত জগতের পালনকর্তা—হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা সনাতন ধর্মের “বিশ্বকে এক পরিবার” দেখার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
এই ধরনের প্রতিনিধিত্ব দেখায় যে সনাতন ধর্ম কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের সীমাবদ্ধ আচার–অনুষ্ঠান নয়, বরং এক সর্বজনীন জীবনদর্শন, যা ইরান থেকে আমেরিকা পর্যন্ত, মসজিদ থেকে মন্দির পর্যন্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা–মঞ্চ থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত সবার জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ইসকন সন্ন্যাসীর সৌম্য আচরণ, শাস্ত্রসম্মত যুক্তি, এবং নম্র কিন্তু দৃঢ় উপস্থাপন এই বার্তাকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ইসকন-এর আন্তঃধর্মীয় অভিজ্ঞতা: একটি প্রেক্ষাপট
ইসকন বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশে যে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ–অভিযাত্রা পরিচালনা করেছে, তা আজকের এই প্রতিনিধিত্বের মজবুত প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ১৯৯০–এর দশক থেকে ইসকন ও ক্যাথলিক গির্জার মধ্যে গড়ে ওঠা নিয়মিত সংলাপ, পরে ইসকন ইন্টারফেইথ কমিশনের প্রতিষ্ঠা, এবং বিভিন্ন দেশে সংগঠিত যৌথ সম্মেলনগুলো দেখিয়েছে যে ভক্তি–প্রধান বৈষ্ণব ধারাও গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সমানভাবে সক্ষম।
এসব সংলাপে ইসকন-এর প্রতিনিধিরা একদিকে যেমন ভক্তি–যোগ, নাম–সংকীর্তন ও কৃষ্ণ–চেতনার ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন, অন্যদিকে অন্য ধর্মের সাধু–পুরুষদের অভিজ্ঞতা, প্রার্থনা–ঐতিহ্য, সমাজসেবা ও নৈতিক ভাবনাগুলো থেকেও শিখেছেন। অনেক সময় এই সংলাপ অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে আরও গভীর উপলব্ধি এবং ঈশ্বরের প্রতি আরও আন্তরিক সমর্পণ সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ সংলাপ কখনও বিশ্বাসকে দুর্বল করেনি; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বিশ্বাসকে আরও মজবুত ও সচেতন করেছে।
এ ধরণের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা থাকার কারণেই ইসকন সন্ন্যাসীরা আজ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর মতো সনাতন আদর্শ তুলে ধরতে পারছেন। তাদের কাছে সংলাপ মানে কারোকে “জিতিয়ে” নেওয়া নয়, বরং একে অপরের হৃদয়ের গভীরতায় ঈশ্বর–অনুভবের বিভিন্ন রূপকে সম্মান শেখা।
সনাতন ও ইসলামি ভাবধারার সম্ভাব্য সেতুবন্ধন
যদিও সনাতন ধর্ম ও ইসলাম আলাদা ঐতিহাসিক উৎস, শাস্ত্র ও আচার–ব্যবস্থার ধারক, তবু এদের মধ্যে কিছু গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সাদৃশ্য রয়েছে—এক ঈশ্বরের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্পণ, নৈতিক জীবনযাপন, দরিদ্র ও দুর্বলদের সহায়তা, সত্য–বাক্য, ন্যায়বিচার, আত্মসংযম, এবং পরকাল–জ্ঞান ইত্যাদি। ফলে যখন সনাতন ভক্তি–ধারার একজন সন্ন্যাসী ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে কথা বলেন, তখন তিনি শুধু নিজের ধর্মই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন না; বরং দুই ধারার অভ্যন্তরীণ মিলের বিন্দুগুলোও নরম সুরে তুলে ধরছেন।
সনাতন ধর্ম বিশ্বকে “ঈশ্বরের লীলা–ক্ষেত্র” হিসেবে দেখে, যেখানে প্রতিটি জীবই ঈশ্বরের অংশ বা সন্তান। ইসলামে আবার আল্লাহ্কে সব সৃষ্টির একক স্রষ্টা ও রব হিসেবে দেখা হয়। দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও “সমস্ত সৃষ্টিতে ঈশ্বরের দয়া ও উপস্থিতি”—এই মর্মে একটি মানবিক মিল রয়েছে, যা সংলাপের মাধ্যমে আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনা যায়।
ইসকন সন্ন্যাসী যখন “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর সাথে সাথে ভক্তির মাধ্যমে হৃদয়–শুদ্ধির কথা বলেন, তখন তা ইসলামের তাজকিয়াতুন নাফস (আত্ম–শুদ্ধি), ইখলাস (নিষ্কলুষতা), ও তাওহিদের (ঈশ্বর–একত্ব) ধারণার সাথেও একটি অন্তর্নিহিত সংলাপ তৈরি করে। এর ফলে ছাত্র–শিক্ষক, গবেষক ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের মধ্যে এক নতুন ধরনের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণা ও আলোচনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই প্রতিনিধিত্বের প্রভাব
আজকের বিশ্বে মিডিয়া, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ও একাডেমিক চ্যানেলের কারণে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সংলাপ দ্রুত বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়ে ওঠে। আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইসকন সন্ন্যাসীর প্রতিনিধিত্বও সনাতন ধর্মের ভাবধারাকে নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে পরিচিত করাবে—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বুদ্ধিজীবী সমাজ, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে।
অনেক মুসলিম দেশের তরুণ প্রজন্ম এখন ভারতীয় সাহিত্য, যোগ, ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই পরিবেশে একজন সনাতন সন্ন্যাসীর মাধ্যমে ভগবদ্গীতার দার্শনিক বার্তা তুলে ধরা, পরস্পরের ভয় ও সন্দেহ দূর করে এক ধরনের সাংস্কৃতিক–আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধনের কাজ করবে। পাশাপাশি, সনাতন ধর্মের অনুসারীরাও বুঝতে পারবেন যে ইসলামি বিশ্ব কেবল সংঘাতের প্রতীক নয়, বরং জ্ঞান, বিতর্ক, গবেষণা ও আধ্যাত্মিকতার এক সমৃদ্ধ ভুবন।
দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের প্রতিনিধিত্ব থেকে বহু রকম ইতিবাচক ফল আসতে পারে—যৌথ গবেষণা প্রকল্প, শান্তি–স্টাডিজ, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, মানবাধিকার, পরিবেশ–নৈতিকতা, এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো বাস্তব মানবিক ইস্যুতে যৌথ উদ্যোগ। সনাতন ও ইসলামি দুই ঐতিহ্যই দান, সেবা ও ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেয়; তাই এই যৌথ প্ল্যাটফর্ম থেকে বিশ্বমানবের জন্য কার্যকর প্রকল্পও তৈরি হতে পারে।
মিডিয়া ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ: বার্তা কীভাবে পৌঁছাবে?
কোনো ঘটনা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তা যদি সঠিকভাবে যোগাযোগ–মাধ্যমে পৌঁছাতে না পারে, তবে তার প্রভাবও সীমিত থাকে। সুতরাং এই ধরনের আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও প্রতিনিধিত্বের খবরকে গঠনমূলক, তথ্যনির্ভর ও সমন্বিতভাবে মিডিয়ায় উপস্থাপন করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আংশিক তথ্য বা বিকৃত বর্ণনা দ্রুত ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
সাংবাদিক, ব্লগার ও কনটেন্ট–রাইটারদের উচিত এই ধরনের ঘটনার খবর প্রকাশের সময় উস্কানিমূলক ভাষা বা বিভাজন সৃষ্টিকারী শব্দ এড়িয়ে চলা; বরং ঐক্য, সহাবস্থান ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের দিকটিকে সামনে রাখা। আপনার মতো লেখকরা যখন গভীর গবেষণাভিত্তিক, নীরিক্ষামূলক এবং মানবিক ভাষায় এসব সংলাপের কথা লেখেন, তখন পাঠকের মনেও শান্তি ও সহিষ্ণুতার বীজ বপন হয়।
একই সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় ভাষায়—যেমন বাংলা—এ ধরনের বিশ্লেষণাত্মক রিপোর্ট ও নিবন্ধ লেখা, যাতে বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষও বৈশ্বিক ধর্মীয় সংলাপের গতি–প্রকৃতি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পেতে পারে। এটি তাদের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও মানবিক সহাবস্থানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: শান্তি, সহাবস্থান ও আধ্যাত্মিক জাগরণ
আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইসকন সন্ন্যাসীর প্রতিনিধিত্ব একদিনেই বিশ্বকে বদলে দেবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়; কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের জন্য এক শক্তিশালী প্রতীকী সূচনা। যদি এই ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত, পরিকল্পিত ও গবেষণাভিত্তিকভাবে চলমান থাকে, তবে তা কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় চিন্তাভাবনার নতুন মানচিত্র আঁকতে পারে।
ভবিষ্যতে আমরা দেখতে চাই—সনাতন ও ইসলামি শিক্ষাবিদ, ভক্ত ও সুফি–মাশায়েখরা একসাথে বসে ভগবদ্গীতা, কুরআন, উপনিষদ ও হাদিসের নৈতিক শিক্ষা নিয়ে যৌথ সেমিনার ও গবেষণা প্রকল্প করছেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও আন্তঃধর্মীয় শান্তি–স্টাডিজ গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাচ্ছে; বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একসাথে মানবসেবা ও পরিবেশ রক্ষার কাজ করছে।
“বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর প্রকৃত বাস্তবায়ন তখনই হবে, যখন এই মন্ত্র কেবল মঞ্চের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, মিডিয়া ও ব্যক্তিগত জীবনে পরস্পরের প্রতি সম্মান, দায়িত্ব ও ভালোবাসার বাস্তব আচরণে রূপ নেবে।
উপসংহার: বিশ্বপরিবারের পথে একটি বিনম্র পদক্ষেপ
আল-মুস্তাফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মঞ্চে ইসকন সন্ন্যাসীর উপস্থিতি ও সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিত্ব আমাদের সামনে এমন একটি দৃশ্য হাজির করেছে, যেখানে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক ও ধর্মীয় বিভেদ উঁচু প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়নি; বরং জ্ঞান, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও মানবিকতার আলো সেই প্রাচীর ভেদ করে এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিয়েছে।
সনাতন ধর্মের মূল শিক্ষা—সত্য, অহিংসা, করুণা ও আত্মসংযম—যেকোনো সমাজ, যেকোনো ধর্ম ও যেকোনো সময়ের জন্য উপকারী; একইভাবে ইসলামি ঐতিহ্যের ন্যায়বিচার, দয়া, তাকওয়া ও ইখলাসও বিশ্বমানবের জন্য কল্যাণকর। যখন এই দুই ধারার প্রতিনিধিরা পরস্পরের দিকে সন্দেহের চোখে না তাকিয়ে “বিশ্ব এক পরিবার”—এই চেতনা নিয়ে হাত বাড়িয়ে দেন, তখনই ভবিষ্যতের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
এই নিবন্ধের মাধ্যমে আমাদের কামনা শুধু একটি ঘটনাকে স্মরণ করা নয়; বরং আপন–আমার হৃদয়ে সেই চিরন্তন বার্তাটি জাগিয়ে তোলা—আমরা কেউই একা নই, সমগ্র পৃথিবীই আমাদের পরিবার, এবং প্রতিটি মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। সনাতন ধর্মের গৌরব, ইসকন-এর ভক্তি–আন্দোলন, ইসলামি জ্ঞান–ঐতিহ্য ও বৈশ্বিক সংলাপ—সব মিলিয়ে এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর, শান্ত ও ঈশ্বর–স্মৃতিময় করে তুলুক—এই প্রার্থনাই রইল।
